top of page

Search Results

91 results found with an empty search

  • উত্তরে আছে মৌন । সৈকত ভট্টাচার্য | Manikarnika.Pub

    উত্তরে আছে মৌন । সৈকত ভট্টাচার্য বিষয় : তিব্বতের ইতিহাসের গল্প প্রচ্ছদ : দেবাশীষ দেব মূল্য : ₹ ৩৫০ মণিকর্ণিকা প্রকাশনী যোগাযোগ (কল ও হোয়াটসএ্যাপ) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির প্রথম অধ্যায় এখানে দেওয়া হল। বোদরাজ্যের রাজা গরম লাগে তো তিব্বত গেলেই পারো! - বিরক্তিভরে কথাটা বলে পাশ ফিরল শুভ। চেন্নাইয়ের গরমে ঘরে বসে সিদ্ধ হচ্ছি সবাই। এই এপ্রিল-মে মাস জুড়ে এখানে যে ‘অগ্নিনক্ষত্রম’ অর্থাৎ সূয্যিমামার চোখ-রাঙানি সহ্য করতে হয়, তার থেকে পরিত্রাণের উপায় ছিল আমাদের আপিস। সূয্যিদেবের ওয়ার্ম আপ করার মধ্যে আপিসের ঠান্ডায় সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ো, আর একেবারে অন্ধকার হয়ে ফুরফুর করে সমুদ্রের বাতাস বইতে যখন শুরু করবে তখন বের হও। এই পলিসি নিয়ে কটা বছর দিব্যি কাটল। এ-বছরটাও আলাদা কিছু হওয়ার কারণ ছিল না যদি না করোনার হামলাটা ঘটত। লকডাউনের চক্করে সবাই ঘর-বন্দি। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরনো না-মঞ্জুর। ব্যাচেলর জীবনের বেসিক নিড - দুবেলার খাবার আর ল্যাপটপ - এসব তো মজুত আছেই। সবজিওলা আর অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যেকার একটা ছোটো দোকান ফ্ল্যাটের দরজায় নিত্যদিনের মাল সরবরাহ করছে। জ্বালা শুধু এই ‘গরমি’কে নিয়ে। বাড়িওয়ালা মিঃ সুধাকর ঘরে একখানা উইন্ডো এসি লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ওভারটাইম খেটে খেটে দিন দুয়েক হল সে-যন্ত্রটি দেহ রেখেছেন। অভ্যেস না থাকলে যা হয়! এই ওয়ান বি-এইচ-কে ফ্ল্যাটে আমরা তিনজনই বাঙালি। ঘরে তিনখানা সিঙ্গল-খাট, বাড়িওলাই পেতে দিয়েছেন। তার একটায় আমি, পাশেরটায় আমার কোম্পানির আইটিতুতো ভাইটি শুভ, আর অন্যটায় জয়দা। জয়দা আমার চেয়ে বছর চারেকের বড়ো। আপিসের কাজের বাইরে ওর একমাত্র এন্টারটেইনমেন্ট হল বই। বাকিসব ইচ্ছে-অনিচ্ছেকে জয়দা কী করে জয় করেছে তা বাতলাতে গেলে ঢাউস উপন্যাস হয়ে যাবে! বেলা খানিক গড়াতেই সেই অকৃতদার ইন্দ্রিয়বিজয়ী অপারজ্ঞানময় উঠে বসে হাতের বইটি বিছানার উপর রেখে পাশে খুলে রাখা স্যান্ডো গেঞ্জি দিয়ে কপাল মুছে যখন বলল, ‘বাপরে! কী গরম রে!’, তখনই সুযোগ বুঝে শুভর টিপ্পনি - গরম লাগে তো তিব্বত গেলেই পারো! জয়দা এমনিতে মিতভাষী, ঘরে আছে না নেই সেটা মালুম হয় না। মোটামুটি বইপত্তরের পাতা, বাঁধাই, অক্ষয়, মায় সিলভার পোকাগুলোর সঙ্গেই ওর মান-অভিমান, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি চলে। কিন্তু একবার যদি ওর সাবজেক্টের মধ্যে কিছু পড়ে যায়, তাহলেই চিত্তির! সঙ্গে সঙ্গে সে-বিষয়ে ওর অর্জিত অঢেল জ্ঞানরাশির বর্ষণ শুরু হয়। বলা বাহুল্য, সেই বর্ষণে আমরা দেদার ভিজি, রীতিমতো সর্দিও লাগে! যেইমাত্র শুভ তিব্বতের নাম নিল - আমি প্রমাদ গুনলাম। গত দুদিন ধরে জয়দা যে-বইটার সঙ্গে উঠছে-শুচ্ছে, মাঝেমধ্যে বাথরুমেও সহগমন করছে, সেটির প্রচ্ছদে বড়ো বড়ো করে লেখা ‘Tibet’ কথাটা লক্ষ্য না করে উপায় নেই। শুভর দিকে কয়েক সেকেন্ড নিষ্পলক তাকিয়ে জয়দা বলল, খুব বুলি ফুটেছে দেখছি! তিব্বত সম্পর্কে কী জানিস শুনি? দলাই লামা জানি, লাসা জানি, চমরীগাই জানি। - শুভর নির্লিপ্ত উত্তর। যাও না! তিব্বতে গিয়ে মুখ ফসকে দলাই লামার নাম বলে দ্যাখো একবার, তারপর চীন কেমন দলাই-মলাই করে বুঝবে! কেন? দলাই লামার কীসব প্যালেস-ট্যালেস আছে না? সব এখন চীনের দখলে। দলাই লামা পালিয়ে এসে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। - বলে মুখে চুকচুক করে একটা শব্দ করে জয়দা আবার বলে, আজকের এই তিব্বত আর স্রোংচান গামপো, ঠিস্রোং দেচেনের তিব্বত! তিব্বতের বিশাল সাম্রাজ্যের বিস্তার চীনকে যে কতবার নাকানি-চোবানি খাইয়েছে তার ইয়ত্তা নেই! এসব গল্প জানিস? শুভ ফটাফট মাথা নেড়ে সারেন্ডার করে দেয়। এইসব ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করে দেওয়াই ভালো। করা উচিত। কিছু তথ্য, কিছু গল্প জানা থাকলেও বলা উচিত অজানা। এই হার মানা কোনো মানুষ বা তার ব্যক্তিগত জ্ঞানের কাছে নয়, গল্পের কাছে। আবহমান কথকতার কাছে। একটা মানুষ যখন কোনো চেনা ইতিহাসই বলতে শুরু করে, তার বলায় এসে লাগে একেবারে নিজস্ব এক সুর, কত জানা ঘটনার অচিন ব্যাখা উঠে আসে বয়ানকালে, হয়তো কথকের অজান্তেই। প্রথম যে-বাঙালি তিব্বত গেছিলেন তার নাম জানা আছে? অতীশ দীপঙ্কর না? - আমি পাশ থেকে ফোড়ন কাটি। আজ্ঞে না। তারও শ-দুয়েক বছর আগে গেছিলেন অতীশের মতোই এক গৃহত্যাগী রাজকুমার। মনে করা হয় তিনি অতীশেরই এক পূর্বপুরুষ। আচার্য শান্তরক্ষিত। প্রায় বাহান্ন বছর বয়সে পায়ে হেঁটে হিমালয় পার হয়ে লাসা পৌঁছেছিলেন। কেন? বুড়ো বয়সে এমন শখ জাগল কেন? - শুভর প্রশ্ন। টেনিদার স্টাইলে একটা হাইক্লাস হাসি হেসে জয়দা বলল, সেটা জানতে গেলে তার অনেক আগের অনেক গপ্পো জানতে হবে। প্রায় দুহাজার বছরের পুরোনো তিব্বতের গল্প। মানে ২০০ থেকে ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। ভারতবর্ষে তখন কে রাজত্ব করছে বল দেখি? জয়দার প্রশ্নের সামনে আমাদের এক গাল মাছি! বিস্তর ভেবে-টেবে শুভ বলল, হরিশচন্দ্র? ভস্মাসুরের মতো দৃষ্টি হানল জয়দা। চাঁদি-ফাটা গরমটা দুম করে অসহনীয় হয়ে উঠল। ঘরের নৈঃশব্দ্য ভাঙতে আমি মিনমিন করে বললাম, মৌর্য্যরা? এবার যেন একটু খুশিই হলেন মহাজ্ঞান। বললেন, কাছাকাছি। মৌর্য্যবংশের শেষ রাজা বৃহদ্রথকে হত্যা করে মগধের সিংহাসনে বসেছেন পুষ্যমিত্র শুঙ্গ। শুরু হয়েছে শুঙ্গ সাম্রাজ্যের। আমাদের গল্পের শুরুও সেই সময়... ‘শুঙ্গ’ শুনে কেমন একটা শুঁড়ওলা আরশোলা মনে হচ্ছে না? - আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকাল শুভ। আহ! খালি বাজে কথা! - জয়দার গলায় একটা ছোটো হুংকার। আচ্ছা আচ্ছা, কন্টিনিউ। পুষ্যমিত্র ছিলেন বৃহদ্রথের সেনাপতি। বৃহদ্রথ বছর সাতেক রাজত্ব করেছিলেন। তারপর একদিন যখন মন দিয়ে মিলিটারির প্যারেড দেখছিলেন, সেনাপতি পুষ্যমিত্র এসে ঘচাং ফু করে দেয়। এ কী! ঘচাং ফু করলেই হল? রাজার সিক্রেট সার্ভিস ছিল না? - শুভ উত্তেজিত। কে জানে, ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু তারাও হয়তো পুষ্যমিত্রর পুষ্যি ছিল। এসব রাজা-গজার তো শত্রুর অভাব নেই! আসল কথা হল ক্ষমতার লোভ! পুষ্যমিত্র হলেন মগধের সিংহাসনে আসীন প্রথম ব্রাহ্মণ রাজা। ওদিকে মৌর্যরা ছিল বৌদ্ধ। ফলে বৌদ্ধরা এতদিন রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় নানারকম সুবিধা পেয়ে এসেছিল। এ ব্যাটা শুঙ্গ সিংহাসনে বসেই বৌদ্ধধর্মকে নির্মূল করে ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘারাম-টংঘারাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করতে শুরু করে দেন... খোদ পাটলিপুত্রেই এক সংঘারামকে জ্বালিয়ে দিয়ে তার সব বৌদ্ধ সন্নাসীদের হত্যা করে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলেন... আমরা আবার বখতিয়ার খিলজিকে খিস্তি করি! ছোঃ! আচ্ছা, তিব্বতের রাজারাও তো বৌদ্ধ ছিলেন? তাহলে এখান থেকেই কি কেউ তিব্বতে গিয়ে… - প্রশ্ন করি আমি। প্রথম প্রশ্নের উত্তর পার্শিয়ালি ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর ‘হয়তো হ্যাঁ’। জয়দা জবাব দেয়। ওর গলায় বেশ একটা ব্যাখ্যা আর গল্প-বলার আগ্রহ ফুটে উঠেছে। মানে? মানে তিব্বতি রাজারা বৌদ্ধ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটা আরও অনেক পরে সেটা। তা ধর… হ্যাঁ, আরও ছ-সাতশো বছর পর তো হবেই। তার আগে হারগিজ নয়। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে ‘হয়তো’র কারণটা হল অন্তত সাতশো খ্রিস্টাব্দের আগে অবধি তিব্বতের লিখিত কোনো ইতিহাসই নেই। কেন? কেন? - দুজনেই প্রায় হায় হায় করে উঠি। শুধু ইতিহাস কেন, লিখিত কিছুই পাবি না। কেন বল তো? আমরা খচখচিয়ে মাথা চুলকোচ্ছি, এমন সময় ওড়িয়া ঠাকুর রবি এসে ঢুকল। রবির ভালো নাম রবি দাস। আমরা ‘রবি ঠাকুর’ বলেই ডাকি। সে এসে দন্ত বিকশিত করে বলল, ভাইয়া, খানা লগা দিয়া। শুভ মাথা চুলকোবার আগে গেঞ্জির তলায় হাত ঢুকিয়ে পেটও চুলকোচ্ছিল। খাবারের নাম শুনে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। আমারও যে খিদে পায়নি একেবারে তা নয়। শুধু জয়দাই অপার নিস্পৃহতার সঙ্গে বলল, কাল তো থোড় বড়ি খাড়া হয়েছিল, আজ কি খাড়া বড়ি থোড়? রবি বালাসোরের লোক হওয়ায় বাংলাটা বুঝতে পারে, তবে ভালো কইতে পারে না। জয়দার প্রশ্ন শুনে বুক ফুলিয়ে শুঙ্গ-মার্কা মুখ করে বলল, কাতলা মাছের ঝোল! ঘ্যাঁট আর ভাত খাওয়া মুখগুলো মাছের নাম শুনে প্রায় এক-বিঘৎ করে হাঁ হয়ে গেল! এগুলো মাছের পিস? - ইঞ্চিখানেক লম্বা আর বোধহয় কয়েক মাইক্রন চওড়া একটা গাদা দুআঙুলে তুলে বলল শুভ। চেন্নাইয়ের মাছওলাদের সমস্যা হল এরা এক্কেবারে মাছ কাটতে পারে না। বলা বাহুল্য আমার থালাতেও মাছের যে ছিটেফোঁটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি পড়েছে, সেগুলিকে দেখে যে কেটেছে তার প্রিসিশনের প্রতি সম্ভ্রম ব্যতীত আর কিছু মনে আসছিল না। জয়দার এসবে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই! ও দেখি থালাখানেক ভাত শুধু ওই দিয়েই সাপটে একটা আলু মুখে পুরে চোখ দুটো আধেক বুজে চিবোচ্ছে! আমার প্রশ্নের উত্তরটা কিন্তু এখনও পাইনি। - সে অবস্থাতেই আলুটাকে সম্ভব গলায় চালান করে দিয়ে কথাটা বলল জয়দা। এই এক সমস্যা লোকটার, কিছু একটা মুখ থেকে বেরুল তো জবাব না পেলে শান্তি নেই। দুহাজার বছর আগে তিব্বতে কেন মানুষ লেখাপড়া করেনি আমি কেমন করে জানব বলুন তো? আমাদের পাড়ার পিন্টুও একবর্ণ লিখতে জানে না - হরিতলায় চুল কাটে - কিন্তু কেন জানে না, তা কি কোনদিন ওকে জিজ্ঞেস করতে গেছি? কী করে জানব? - বেজার মুখে বলি। ভাব, ভাব। লক্ষণ সেনের মতো অমন সারেন্ডার করিস না। - বলে জয়দা মুখে একটা দিব্যভাব এনে বেসিনে গিয়ে ফুচুৎ ফুচুৎ করে কুলকুচি করতে লাগল। আমি আর শুভ মুখ চাওয়াচায়ি করছি, জয়দা তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছে, ‘ঘ্রাউউৎ’ করে একটা পেল্লায় ঢেকুর তুলে বললেন, লেখার জন্য কী প্রয়োজন? আমি বললাম, কালি। শুভ উত্তর দিল, মানুষ। জয়দা বলল, আরও বেসিকে যা। কী না হলে লেখা হবেই না? কালি ছাড়া পাথরে কুঁদেও লেখা যায়। আর মানুষ ছাড়া কি তোর মত উল্লুক এসে লিখবে? পরক্ষণেই আমাদের বুদ্ধির উপর ভরসা ছেড়ে জয়দা নিজেই বলল, অক্ষর। লিপি। স্ক্রিপ্ট। অক্ষর না থাকলে লিখবে কী করে? তিব্বতি ভাষার কোন লিপি ছিল না। অনলি কথ্যভাষা। তাই শুধু ইতিহাস কেন, কিছুই লেখা হয়নি হাজার হাজার বছর ধরে। ফলে দেশটার ইতিহাস পুরো অন্ধকারে ঢাকা। পরে রাজা স্রোংচান গামপোর সময় লিপি তৈরি হয়। সে-গল্প যথাসময়ে বলব। কিন্তু তারপরেও যা ইতিহাস লেখা হয়েছে, সবই প্রায় ধর্মীয় ইতিহাস। তার মধ্যে ধর্মীয় উপকথা, গল্প-কাহিনি এত মিলেমিশে গেছে যে আসল ঘটনা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর! লিপি কেমন করে তৈরি হয়? - প্রশ্ন করলাম আমি। রহু ধৈর্যং। আগের কথা আগে বলি। বেশ। মুখে আনার দানা ফেলে চুষতে চুষতে আমরা আবার ঘরে ফিরে গল্পের লোভে গ্যাঁট হয়ে বসলাম । জয়দা পাশের বালিশটা কোলে টেনে নিয়ে গুছিয়ে বসে বলে চললেন, এদিকে পুষ্যমিত্র শুঙ্গ যখন কেলোর কীর্তি করে বেড়াচ্ছেন, তখন তিব্বতের প্রথম রাজা 'ঞাঠি চানপো'র আবির্ভাব। আবির্ভাব? ভগবান নাকি? - হ্যা হ্যা করে খানিক হেসে নিল শুভ। ইয়েস। ভগবান। অন্তত তিব্বতিরা সেরকমই ভেবেছিল। আসলে উনি তিব্বতি ছিলেন না। সম্ভবত উত্তরভারতের কোনও রাজ্য থেকে হিমালয় পার হয়ে তিব্বতে পৌঁছন। পায়ে হেঁটে। পায়ে হেঁটে এভারেস্ট পার হয়ে গেল? তাহলে তো তেনজিঙের আগে… - শুভ হতঅবাক। এভারেস্ট কেন পার হতে যাবে? তাহলে? তিব্বত যাবে কী করে? কেন? কলকেতা, ডায়মণ্ডহারবার, রানাঘাট, তিব্বত, ব্যস! সিধে রাস্তা, সওয়া ঘণ্টার পথ, গেলেই হল। - বলেই খ্যাঁকখ্যাঁকিয়ে একটু হেসে নিল জয়দা। ভাবখানা এই যে শুভর উপর ভালো শোধ নেওয়া গেছে। হাসি-টাসি শেষ হলে আবার গম্ভীরভাবে বলল, অনেক গিরিপথ আছে। তবে অত বছর আগে কীভাবে কোন পথে গেছিল এখন বলা যাবে না। হিমালয়ের মত নবীন পর্বত - রোজই ভাঙছে-গড়ছে। মনে নেই, সেই যে বলেছিলাম সেবার গোমুখে গিয়ে দুর্যোগে আটকে গেলাম, তারপর তো গোমুখ যাওয়ার রাস্তাটাই বদলে গেল। তাই দুহাজার বছর আগে সে ভদ্রলোক কোন রাস্তায় যে ওখানে গিয়ে পৌঁছেছিলেন তা এখন বলা মুশকিল। কিন্তু উনি গেছিলেন। কেন গেছিলেন - সে ব্যাপারে নানা মুনি নানা মত। অনেকে বলেন এখানকার কোনো রাজ্যের রাজা ছিলেন, শত্রুর হাত থেকে পালানোর জন্য রমণীর ছদ্মবেশে পাহাড় টপকে হাজির হন ওপারে। আবার অনেকে পুরাণের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছেন ইতিহাসকে। তারা বলেন উনি নাকি কোশলরাজ প্রসেনজিতের কোনো এক উত্তরসূরি, নাম ‘বুদ্ধশ্রী’। বিরোধীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য নারীর ছদ্মবেশ নিয়ে পালিয়েছিলেন। কেউ বলেন উনি ছিলেন কৌরবপক্ষের এক রাজা, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে লড়েছিলেন, শেষে পাণ্ডবরা জিতে যাওয়ায় তাদের হাত এড়ানোর জন্য একেবারে তিব্বত। মোদ্দা কথা হল, উনি যেই হোন না কেন, শত্রুর হাত থেকে চাচা আপন প্রাণ বাঁচা বলে হাজির হয়েছিলেন হিমালয় টপকে সেই ‘বোদরাজ্যে’। কী? বোদরাজ্য? সে আবার কী? এই যে বললে তিব্বত! - আমি নাক কুঁচকোলাম। যাহা বাহান্ন, তাহা তিপ্পান্ন! আচ্ছা, চট করে একটা ক্যুইজ হয়ে যাক - ভারতবর্ষের আগে কী নাম ছিল? শুভ তাড়াহুড়োয় ‘জম্বুদ্বীপ’ বলতে গিয়ে বলে ফেলল ‘জাম্বুবান’। আমি খোঁচা দিয়ে বললাম, তোর না, ভারতবর্ষের নাম জিজ্ঞেস করেছে! ও কেমন একটা হৃদি-ভাঙা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এৎ তু ব্রুতে! আহ! এত বাজে বকলে কি আর হিস্ট্রি চোখে দেখবার এনভায়রনমেন্ট তৈরি হয় রে! - গম্ভীর গলায় একটা মিনি হুঙ্কার ছেড়ে জয়দা বালিশের তলা থেকে একটা আধখাওয়া সিগারেট বের করে সেটা খুব কায়দার সাথে নাকের তলায় ঘষতে লাগল। আমি বললাম, সিগারেটেও রেশন করছ? হুঁ, লাইটার দিয়ে সিগারেটটা ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে ঘরটাকে ধোঁয়াময় করে আমাদের কাশিয়ে টাশিয়ে একসা করে গুরুদেব বলল, রেশন না করলে আমার সিগারেটর সাপ্লাই কোথা থেকে আসবে শুনি? আন্না তো দোকানের ঝাঁপ ফেলে তিরুনালভেলি চলে গেছে। বুঝলাম সমস্যা গভীর! কথা না বাড়িয়ে বলি, তারপর? ঞাট্রি কানকো কোথায় একটা পৌঁছল... কানকো! তোর কানকো কেটে নেব! চানপো। ইংরিজিতে লিখলে হয় Tsanpo. এ কী! সেটার উচ্চারণ তো… উচ্চারণ তো... - এইটুকু বলে জিভ দিয়ে টাকরায় কেমন একটা অদ্ভুত শব্দ বের করতে লাগল শুভ। জয়দা সেটা দেখে হেসে বলল, হচ্ছে না তো? হবে না... ওটার উচ্চারণ চানপোই হয়। যেমন সিকিমে ছাঙ্গু লেকে গেছিস তো, অথবা পেমিয়াংচি গুম্ফা? বানানগুলো দেখেছিস? ‘Tsa’ দিয়েই লেখা হয়। আসলে এটা একটা তিব্বতি বর্ণ যার উচ্চারণ বাংলা 'চা' বা 'ছা'-এর কাছাকাছি। টেরি ওয়াইলি নামে এক মার্কিন তিব্বত-বিশেষজ্ঞ তিব্বতি হরফগুলিকে ইংরিজিতে ট্রান্সলিটেরেট করেন। সম্ভবত ১৯৫৯ সাল নাগাদ। এটাকে ওয়াইলি (Wylie) ট্রান্সলিটেরেশন বলা হয়। বুঝলি? শুভ ঢক করে মাথা নেড়ে দিল। জয়দার সিগেরেটটা এত কথার ফাঁকে অর্ধেক থেকে এক চতুর্থাংশ হয়ে গেছে। আগুনটা ফিল্টারে ঢুকব ঢুকব করছে। জয়দা একটা যাকে বলে বুক ভরা টান দিয়ে ক্যারমের স্ট্রাইকারের মত জানলা দিয়ে ফিল্টারটা ফেলে দিল। ও কী! কার মাথায় পড়বে ঠিক আছে? অমন করে ফেলতে বারণ করেছি না!¾হাঁ হাঁ করে উঠলাম আমি। পড়বে না!—চোখ বন্ধ করে একগাল হেসে জয়দা বলল, ম্যাক্সিমাম আমাদের কার্নিশেই পড়ে আছে। দেখ। ইনিশিয়াল ভেলোসিটি, এঙ্গেল সব মেপে প্রোজেক্টেইলের অঙ্ক কষেই তো ছুঁড়ি যাতে ঠিক কার্নিশে ল্যান্ড করে! যাক গে... যেটা বলছিলাম... ‘বোদ’ - তিব্বতের প্রাচীন নাম। অনেকে ‘বোদ’ না বলে… যাক গে, সেটা আবার বাংলায় শুনলে নামের চেয়ে বেশি বদনাম মনে হবে। বাদ দে। ‘বোদ’ কথার অর্থ সম্ভবত ‘প্রাচীন ভূমি’ বা ‘আদি বাসস্থান’ জাতীয় কিছু। সেটা নিয়ে বিস্তারে পরে বলছি। এখন আমাদের রাজামশাই হিমালয় টপকে চলেছেন বোদরাজ্যে, আপাতত সেখানে ফিরে আসি। যদিও এসবই গল্পকথা, কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। প্রায় সাত-আটশো বছর পরে লিখিত ইতিহাস নির্ভর করে এসব ধারণা পাওয়া গেছে। সে-ইতিহাসও কতটা ভরসাযোগ্য—বলা মুশকিল। কেন? - জিজ্ঞেস করি আমি। কারণ - ধর্ম। পৃথিবীতে ইতিহাস যা লেখা হয়েছে তার অধিকাংশই রাজার অ্যাপয়েন্ট করা ঐতিহাসিকের লেখা। ফলে রাজনৈতিক কথা বেশি পাওয়া যায়। আর কিছু ইতিহাস লেখা হয় ধর্মের প্রভাবে। যেমন তিব্বতে লেখা হয়েছিল। বৌদ্ধধর্ম সেখানে প্রসারিত হওয়ার পর ইতিহাস লেখা শুরু হয়, আর লেখেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাই। উভয়ক্ষেত্রে পক্ষপাত থাকলেও, রাজনৈতিক প্রভাবে হয়তো রাজার নামে প্রচুর ভালো ভালো কথা থাকতে পারে, কিন্তু উদ্ভট অতিমানবিক গল্পকথা থাকে কম, যেটা বিস্তর রয়েছে তিব্বতের ইতিহাসে। ফলে গল্প সরিয়ে সত্যি ঘটনাকে বুঝতে পারা একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। বুঝলি? বুঝলাম। তাহলে ঞাঠি চানপোর সময়কাল বা এই ভারত থেকে আসার ঘটনা সত্যি নাও হতে পারে? - আমি শুধোলাম। এমনকি ওইরকম কোনো লোকের অস্তিত্বই হয়তো ছিল না। তাও হতে পারে! ইনফ্যাক্ট বর্তমান পণ্ডিতদের মতে তিব্বতের প্রথম রাজা স্রোংচান গামপো সেভেন্থ সেঞ্চুরির। ঞাঠি চানপোর গল্প বানিয়েছেন বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা। আর দুজনের মধ্যেকার লম্বা সময়টাকে মেক আপ দিতে আরও বিশ-পঁচিশখানা রাজার নাম বিভিন্ন স্থানীয় প্রাচীন লোককথা থেকে তুলে স্রেফ বসিয়ে দেওয়া হয়েছে - কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি ছাড়াই। এ বাবা! এইভাবে ইতিহাস রচনা হয়েছে! এ তো পাতি ব্যাক ক্যালকুলেশন! - শুভ মন্তব্য করল! একদম। গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে জয়দা আবার শুরু করল - হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম। এইসব জল মেশানো ইতিহাসের সত্যমিথ্যা বিচার করা খুবই মুশকিলের কাজ। অবিশ্যি সেসব কঠিন কর্ম পণ্ডিতেরা বিস্তর করেছেন। এখনও করে চলেছেন। এটা ওদের পড়াশোনার কাজের মধ্যেই পড়ে। কদিন আগেই এক টিবেটোলজিস্টের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ইমেলে। ভদ্রলোকের নাম স্যাম ভ্যান শাইক। ইউনিভার্সিটি অফ ম্যানচেস্টার থেকে তিব্বতি বৌদ্ধ সাহিত্য নিয়ে ডক্টরেট। জাতে ব্রিটিশ। বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতেই প্রোজেক্ট ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত। স্যামের একটা রিসার্চ পেপার আমার হাতে আসে। একদম হালে প্রকাশিত। সেইটার কথা পরে বলব। আসলে, ওটা উলটে-পালটে দেখতে দেখতেই তিব্বতের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে বেশ আগ্রহ জন্মাল। ভদ্রলোক সদাশয় ব্যক্তি। মেইল করে কিছু জানতে চাইলেই ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে গুছিয়ে উত্তর চলে আসে। স্যামের যে-কাজটার কথা জেনে আমার এই উৎসাহ, সেটা আসবে আমাদের গোটা গল্পের শেষদিকে। এখন আপাতত ফেরা যাক রাজা রূপতির গল্পে। এই রূপতি আবার কার পতি? এক্ষুনি তো অন্য একটা কার কথা হচ্ছিল! - শুভ আবার গল্পে মজ্জমান! রাজা রূপতির কাহিনি পাওয়া যায় ‘দ্য রেড এন্যাল্স’ নামে একটি বইয়ে। কুঙ্গা দোরজে নামে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ১৩৪৬ থেকে ১৩৬৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এ-বইখানা লেখেন। ভদ্রলোক অবশ্য শেষবয়সে এসে সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। তার আগে দীর্ঘদিন কাটিয়েছিলেন মোঙ্গল রাজপরিবারে। সেটা ইমপর্ট্যান্ট নয়, গুরুত্বপূর্ণ হল এই গ্রন্থকে বলা হয় তিব্বতের ইতিহাসের এক আকর গ্রন্থ। এর আগে যা লেখা হয়েছে, সেসব তেমন খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটাই তিব্বতের বৌদ্ধ ইতিহাসের প্রাচীনতম গ্রন্থ যা বর্তমান ঐতিহাসিকদের হাতে এসেছে। জয়দা একটা বালিশ টেনে নিয়ে কাত হয়ে আধশোয়া হল। এতক্ষণ বসে থেকে কোমর ধরে গেছে। আমিও হেলান দিয়ে বসলাম। জয়দা আবার বলতে লাগল - এখানে বলছে রাজা রূপতি ছিলেন কৌরব পক্ষের এক রাজা। কৌরবদের সঙ্গে জুটেছিলেন নিজের আখের গোছাতে। যেই দেখেছেন কৌরবরা পাণ্ডবদের কাছে ব্যাপক ঝাড় খাচ্ছে অমনি কেটে পড়েছিলেন। য পলায়তি স জীবতি। উনি নারী ছদ্মবেশে পাণ্ডবদের হাত থেকে পালিয়ে হাজির হলেন হিমালয়ে। এটা গল্প নম্বর এক। গল্প নম্বর দুই - যেটা আগে বলছিলাম। কোশলরাজ প্রসেনজিতের এক বংশধরই হিমালয় পার হয়ে তিব্বতে পৌঁছেছিলেন। কোশলরাজ প্রসেনজিতের বংশধরকে প্রথম রাজা সাজানোর পেছনে আবার একটা উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছেন অনেক ঐতিহাসিক। তারা বলছেন, যেহেতু কিছু শতাব্দী পরে এইসব ঘটনার কথা লিখে গেছেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাই, তাই তারা যে নিজেদের ধর্মকে মহিমান্বিত করার চেষ্টাতে রত ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা প্রসেনজিত ছিলেন বুদ্ধদেবের একজন প্রিয় শিষ্য। মগধরাজ বিম্বিসারের শ্যালক। সাঁচি স্তূপের বিখ্যাত তোরণগুলির একটিতে বুদ্ধের সাথে প্রসেনজিতের সাক্ষাতের চিত্রও খোদিত আছে। সুতরাং বুঝতেই পারছিস - তার সঙ্গে তিব্বতি রাজবংশকে যুক্ত করে তার গৌরববৃদ্ধি করা এই কাহিনি নির্মাণের উদ্দেশ্য হওয়াটা আশ্চর্য নয়। গল্প তিন - প্রাচীন তিব্বতে যখন দৈত্য- দানো ঘুরে বেড়াত, সেই সময় বৎসরাজ মৎসরাজ? মানে ইলিশ? - হঠাৎ যেন স্বপ্ন থেকে জাগরণ ঘটল শুভর! হে ঈশ্বর! ওরে হতভাগা একটু ইতিহাস বইয়ের কথা মনে কর। খালি খাই খাই! ষোড়শ মহাজনপদের নাম মনে আছে? শুভ মাথা নেড়ে দিল। মনে নেই। আমারও মনে নেই। দু একটা নাম মনে পড়ছিল। গান্ধার, কোশল... আর কীসব ছিল না? কাকা কোথায়? কমল কুমার অন্য অন্য অনেকের চেয়ে বেশি শুনেছেন। মামার গায়ে পায়ে মস্ত মস্ত বিছে! - জয়দা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কী একটা বলল, আমাদের দুজনেরই শুনে মনে হল তিব্বতি ভাষা! এটা কী জয়দা? - মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করি। ষোড়শ মহাজনপদ! প্রতিটা মহাজনপদের নামের শুরুর একটা করে বর্ণ দিয়ে লেখা ত্রিবাক্য। কাশী, কোশল, কম্বজ, কুরু, অঙ্গ - যার থেকে ‘বঙ্গ’ শব্দটির উৎপত্তি ধরা হয়, অস্মক, অবন্তী, চেদি, বৎস, শূরসেন, মল্ল, গান্ধার, পাঞ্চাল, মগধ, মৎস, বৃজি! বাপরে! এতগুলো নাম মনে আছে? হ্যাঁ। চেষ্টা করলেই থাকে। নিজেদের দেশের ইতিহাস ভুললে চলে? এই বলে একটা ইঞ্চি পাঁচেক লম্বা হাই তুলে জয়দা বলল, এই ষোড়শ মহাজনপদের একটা ছিল ‘বৎস’। অবিশ্যি মৎস্য নামেও একখানা ছিল, যদিও সেটা ইলিশ নয়। এনি ওয়েজ, এই বৎসরাজ উদয়নের এক পুত্র জন্মায়। রাজপুত্র জন্মালে দেশে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বইল না। কারণ যে জন্মাল সে এক বিকৃতদেহ মানুষ। চোখের পাতাগুলো নাকি নীচের দিকে আটকানো, উপরদিকে বন্ধ হয়। হাতের পায়ের আঙুল সব ব্যাঙের মতো - পাতলা মেমব্রেন দিয়ে জোড়া। এমন চেহারার ছেলে দেখে রাজা খুব ভয় পেয়ে আদেশ দিলেন - এই পুত্রকে নদীতে ভাসিয়ে দাও। কর্মচারীরা সেই আদেশ পালন করল। কিন্তু একটি দুধের শিশু, সে যতই বিকৃতদেহধারী হোক না কেন, তাকে অমনভাবে ভেসে যেতে দেখে এক কৃষকের মায়া হল। সে বাচ্চাটাকে নদী থেকে তুলে নিয়ে লালন-পালন করল। পরে বড়ো হলে এই সব ঘটনা জেনে সে মনের দুঃখে হিমালয়ে চলে যায়। তারপর একদিন হিমালয় পার হয়ে হাজির হয় সোজা তিব্বতে! তারপর? অচেনা একটা দেশ। মানুষজনের দেখা পাওয়া যায় না। দিগন্ত বিস্তৃত মালভূমি, পাহাড়। রুক্ষ শীতল জায়গা সব। ঘুরতে ঘুরতে চানথাং গোশি বলে একজায়গায় দেখা হয়ে গেল একদল মানুষের সঙ্গে। তারা ছিল বোন পুরোহিত। কী পুরোহিত? - শুভর জিজ্ঞাসা। বোন। তিব্বতের প্রাচীন ধর্ম। ভাইও আছে নাকি? - নিমেষে বদবুদ্ধির পোকা কিলবিলিয়ে উঠল শুভর মাথায়। জয়দা অবশ্য সেটাকে অত পাত্তা দিল না। বলল, বোন নিয়ে বিস্তারিত পরে বলছি। এটুকু শুনে রাখ যে বৌদ্ধধর্ম প্রবেশ করার আগে বোনই ছিল তিব্বতের জাতীয় ধর্ম। সেই ধর্মের কয়েকজন পুরোহিতের সঙ্গে মোলাকাৎ হল আমাদের রাজপুত্তুরের। তারা তো অমন অদ্ভুত গড়নের মানুষ দেখে অবাক। এ আবার কে! কোত্থেকে উদয় হল! তারা এসে স্থানীয় ভাষায় জিজ্ঞেস করল, কে তুমি? এ তো কিছুই বুঝল না। শেষে নাকি হাত তুলে আকাশের দিকে দেখিয়ে বোঝাল যে সে ঈশ্বর দ্বারা প্রেরিত হয়ে এখানে হাজির হয়েছে। যদিও আমার বিশ্বাস যে ওদের ভাষা না বুঝে কৃষক-পালিত রাজপুত্র হাত তুলে বোঝাতে চেয়েছিল যে সে সুদূর ভারতবর্ষ থেকে এসেছে। কিন্তু পুরোহিতেরা বুঝল উল্টো। অবিশ্যি তাতে ক্ষতি কিছু হল না! ঈশ্বর-প্রেরিত এই আশ্চর্যদর্শন মানুষকে নিজেদের মধ্যে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল তারা। সবাই মিলে তাকে কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে চলল নিজেদের গ্রামে। সেখানে গিয়ে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে জানিয়ে দেওয়া হল যে এই দেবপুরুষ আমাদের রাজা। নাম হল ‘স্কন্ধবাহিত শক্তিধর’ যার তিব্বতি অনুবাদ ‘ঞাঠি চানপো’। বাপরে! এত কিছু ডিটেইলে জানা গেল কী করে? কিছুই জানা যায় নি। আট-ন’শো বছর পর সম্রাট রলপাচেনের সময় তিব্বতের ইতিহাস যখন প্রথম লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু হল তখন মুখে মুখে চলে আসা এইসব উপকথা স্থান করে নিয়েছে ইতিহাসে। তারপর কী হল? তারপর নির্বিঘ্নে রাজত্ব চলতে লাগল। তিব্বতিরা নির্দ্বিধায় ঞাঠি চানপোকে তাদের প্রথম রাজা হিসাবে মেনে নিয়েছে। তার অবিশ্যি কারণ আছে। তিব্বত তখন একটা দেশ বা রাজ্য হিসাবে ছিল না। বারোখানা ছোটো রাজ্য ছড়িয়ে ছিল তিব্বত জুড়ে। তার মধ্যে একটি ছিল এই ইয়ারলুংদের। এদের বাস ছিল ইয়ারলুং উপত্যকায়। সে-উপত্যকার বুক চিরে বয়ে যেত ইয়ারলুং সাংপো নদী। সাংপো, মানে, ব্রহ্মপুত্র? - আমি জিজ্ঞেস করি। ভূগোলে পড়েছিলাম মনে পড়ল। তিব্বতি ভাষায় ‘সাংপো’ মানে নদী। যেমন শতদ্রুর তিব্বতি নাম ‘লাংকেন সাংপো’ বা সিন্ধুর নাম ‘সেংগে সাংপো।’ ব্রহ্মপুত্রর নাম ‘ইয়ার্লুং সাংপো’। আর এর অববাহিকাকে সেই জন্য ‘ইয়ার্লুং অববাহিকা’ বলা হয়। যাই হোক, এই ইয়ারলুং গোষ্ঠীর রাজারাই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মকে তিব্বতে প্রসারিত করার উদ্যোগ নেন। আর বাকিদের থেকে শক্তিশালী হয়ে লাসা নগরীর প্রতিষ্ঠা করে জাঁকিয়ে বসেন। সেই জন্য এদের পূর্বসূরী হিসাবে ঞাঠি চানপো পেয়ে গেছেন প্রথম রাজার মর্যাদা। অনেকে বলেন ঞাঠি চানপোর আসল নাম, মানে ভারতবর্ষে থাকাকালীন নাম ছিল, ‘বুদ্ধশ্রী’। যদিও এসবের পরেও তিব্বতের ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত প্রথম সম্রাট স্রোংচান গামপো অবধি একটা কয়েকশো বছরের গ্যাপ। তাহলে বৌদ্ধধর্মটা পৌঁছল কবে তিব্বতে? ধৈর্য ধর। এ-উত্তর পেতে গেলে এখনও অনেক শতাব্দী পার হতে হবে। শুভ অনেকক্ষণ ধরেই উশখুশ করছিল। গল্প শুনতে শুনতে বিকেল পার করে ফেলেছি খেয়ালই নেই। জয়দা একটু থামতে এবার ও বলেই ফেলল, বলছি তিব্বতিরা চা খায়? হ্যাঁ! চা খায় কী রে! চা ওদের প্রায় স্টেপলের পর্যায়ে পড়ে! ঠান্ডায় জলের বদলে বারবার চা খাওয়াটাই ওরা প্রেফার করে বেশি। চমরীগাইয়ের দুধের থেকে তৈরি মাখন দেওয়া চা! - জয়দা চোখ বন্ধ করে চমরীগাইয়ের দুধের মাখনের ব্যাপারটা একটু অনুভব করবার চেষ্টা করল। করুণমুখে শুভ বলল, তা চমরীগাই না হলেও আমরা একটু চেন্নাইগাইয়ের দুধের চা কি খাব না?

  • About | Manikarnika.Pub

    Manikarnika Prakashani Office Adress - 119, Abhay Patuli Lane, Sukhsanatantala, Chandannagar Hooghly. Email us at - manikarnika.pub@gmail.com Call us on - 8240333741

  • Contact us | Manikarnika.Pub

    Contact This is your Contact section paragraph. Encourage your reader to reach out with any questions or comments. Contact Details First Name Last Name Email Phone Message Send Thanks for submitting!

  • About Us | Manikarnika.Pub

    About Us A bilingual (Bengali and English) book publication centered at Chandannagar in Hooghly district, West Bengal, India. Our titles are available from our online store ('Buy our titles'), Amazon.in and from several physical outlets at College Street, Kolkata. In addition, we promptly ship books ordered at our WhatsApp no: 8240333741. Inviting original manuscripts and translation works encompassing Novels, Short stories, Essays, Personal Proses, Poetry, Travel Stories, and any kind of thoughtful content. Email us your manuscript at : manikarnika.pub@gmail.com

  • পালামৌ । সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | Manikarnika.Pub

    পালামৌ । সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিষয় : ভ্রমণকাহিনি প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: ঋভু চৌধুরী নামাঙ্কণ : শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় মণিকর্ণিকা প্রকাশনী মূল্য : ₹ ২০০ যোগাযোগ (Call or WhatsApp) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির একটি অংশ এখানে দেওয়া হল। ‘পালামৌ’ আখ্যানটি ইতোমধ্যে কয়েকবার বই রূপে প্রকাশিত, এবং বর্তমানেও সুলভ। তবু পাঠ-অভিজ্ঞতাকে ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা করে তোলবার প্রেরণায় তাড়িত হয়ে পরিচিত সে ভ্রমণকাহিনির আরেকটি সংস্করণ প্রকাশ করছে মণিকর্ণিকা প্রকাশনী। আশ্চর্য লেখাটির সঙ্গে সাজিয়ে দেওয়া হল শিল্পী ঋভু চৌধুরীর মোমরঙে আঁকা কয়েকটি সজীব ছবি, প্রচ্ছদে রইল তাঁরই একটি ছবি। নির্জন পালামৌ অঞ্চলে পাঠকের যাত্রাটি হোক রূপময় ও তথ্যভারহীন, এমনটাই আমাদের অভিলাষ। সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনাটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় (পৌষ ১২৮৭ – ফাল্গুন ১২৮৯), ছয়টি পরিচ্ছেদে; সেই পাঠই প্রকাশ করা হল। পুরোনো বানান রইল অবিকল। একটি জায়গা পাঠককে বর্তমান নামে চেনানোর জন্য শুধু একস্থানে যুক্ত হল প্রয়োজনীয় ফুটনোট। পড়বার সময় অক্ষর-রেখা-ছবি-পাতা ছাপিয়ে এই বই যদি হয়ে ওঠে এক আক্ষরিক অঞ্চল- বৃক্ষে আকীর্ণ, ‘মধুদ্রুম’-এর ফুলে রঙিন, ও ‘মৌয়া’গন্ধে আকুল- তাহলে পুনর্প্রকাশ সার্থক হয়। প্রকাশক

  • স্মৃতির রেখা । বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় | Manikarnika.Pub

    স্মৃতির রেখা । বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয় : দিনলিপি প্রচ্ছদ : শাশ্বত বন্দোপাধ্যায় মণিকর্ণিকা প্রকাশনী মূল্য : ₹ ২৫০ যোগাযোগ (কল ও হোয়াটস্অ্যাপ) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির একটি অংশ এখানে দেওয়া হল। কাল তোমাকে দেখতে পেয়েছি। শেষরাত্রের কাটা-চাঁদের ও শুকতারার পেছনে তুমি ছিলে। এই শেষ রাতের আকাশের পেছনে, এই ফুল ফোটা নিমগাছের ডালের সঙ্গে, এই সুন্দর শান্ত ঘন নীল আকাশে এক হয়ে কেমন করে তুমি জড়িয়ে আছ। কত প্রাণী, কত গাছপালার বংশ তৈরী হ’ল, আবার চলে গেল - ঐ যে পায়রাদল উড়ছে, ঐ যে নারকেল গাছটার মাথা ভোরের বাতাসে কাঁপছে, ঐ যে বন-মূলোর ঝাড় ছাদের আলসেতে জন্মেছে, আমার ছাত্র বিভূতি - দু-হাজার বছর আগে এরা সব কোথায় ছিল? দু’হাজার বছর পরেই বা কোথায় থাকবে? এদের সমস্ত ছোটখাটো সুখদুঃখ আনন্দ-হতাশা নিয়ে ছোট্ট বুদ্ধুদের মত অনন্ত গহন গভীর কালসমুদ্রে কোথায় মিলিয়ে যাবে, তার ঠিকানাও মিলবে না - আবার নতুন লোকজন ছেলেপিলে আসবে, আবার নতুন ফুলফলের দল আসবে, আবার নতুন সব সুখদৈন্য হর্ষহতাশা আসবে, কত মিষ্টি জ্যোৎস্না-রাত্রির মাধবী বাতাস আবার বইবে, পুরোনো উজ্জয়িনীর কেশধূপ বাস যেমন মদির ছিল, ভবিষ্যৎ কোন বিলাস-উজ্জয়িনীতে নতুন কেশরাশি পুরোনো দিনের চেয়ে কিছু কম মদির হয়ে উঠবে না, কত গ্রাম্য-নদী ভবিষ্যতের অনাগত গ্রাম-বধূদের সুখদুঃখ সম্ভার নিয়ে বয়ে চলবে… আবার তারা যাবে, আবার নতুন দল আসবে। কিন্তু তুমি ঠিক আছ। হে অনন্ত, যুগে যুগে তুমি কখনো বদলে যাও না। সমস্ত পরিবর্ত্তনের মধ্য দিয়ে, সমস্ত ধ্বংস-সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অপরিবর্ত্তিত, অনাহত তুমি যুগ থেকে যুগান্তরে চলেছ। এই দৃশ্যমান পৃথিবী যখন আকাশে জ্বলন্ত বাষ্পপিণ্ড ছিল, তারও কত অনন্তকাল পূর্ব্ব থেকে তুমি আছ, এই পৃথিবী যখন আবার কোন দূর অনির্দ্দিষ্ট ভবিষ্যতে, যখন আবার জড় পদার্থের টুকরোতে রূপান্তরিত হয়ে দিকহারা উল্কার গতিতে উদ্ভ্রান্ত হয়ে অনন্ত ব্যোমে ছোটাছুটি করবে, তখনও তুমি থাকবে। কালের অতীত, সীমার অতীত, জ্ঞানের অতীত কে তুমি - তোমাকে চেনা যায় না। অথচ মনে হয়, এই যেন বুঝলাম, এই যেন চিনলাম। শেষ রাত্রের নদীর জলে যখন চিকচিকে মিষ্টি জ্যোৎস্না পড়ে, শেওলায় কূলে তাল দেয়, তখন মনে হয় সেখানে তুমি আছ, ছোট্ট ছেলে তার কচি মুখ নিয়ে ভুরভুরে কচিগন্ধ সমস্ত গায়ে মেখে যখন নরম হাতদুটি দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে, যেন মনে হয় সেখানে তুমি আছ, ওরায়ণ যখন পৃধিবীর গতিতে সমস্ত রাত্রির পরে দূর পশ্চিম আকাশে ঝুলে পড়ে, সেই রুদ্র প্রচণ্ড অথচ না-ধরা-দেওয়া-গতির বেগে তুমি আছ, জনহীন মাঠের ধারে গ্রাম্য ফুলের দল যখন ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে অকারণে হাসে তখন মনে হয় তাদের সেই সরল প্রাণের প্রাচুর্য্য তার মধ্যে তুমি আছ। তাই বলছিলাম যে কাল শেষরাত্রে তোমাকে হঠাৎ দেখলাম। অন্ধকার প্রহরের শেষ রাত্রের চাঁদ তার পার্শ্ববর্ত্তী শুকতারার পেছনে। তোমায় প্রণাম করি - আজ কলেজের কালভার্ট বেয়ে উঠছিলাম। বেলা পাঁচটা, ঠিক সন্ধ্যেটা হয়ে এসেছে, ছোট ছোট সেই অজানা রাঙা ফুলগাছগুলোর দিকে চেয়ে কেমন হঠাৎ আনন্দ এসে পৌঁছলো - নাথনগরের আমগাছগুলোর ওপর সূর্য্য অস্ত যাচ্ছে, কেমন রাঙা হয়ে উঠেছে সেদিকের আকাশটা - এই সামান্য জিনিষের আনন্দ, কচিমুখের অকারণ হাসি, রাঙা ফুলগাছটা, নীল আকাশের প্রথম তারা, ঐ যে পাখীটা বাঁকা ডালে বসে আছে, সবশুদ্ধ মিলে এক এক সময় জীবনের কেমন গভীর আনন্দ এক এক মুহূর্ত্তে আসে। মানুষ এই আনন্দ জানতে না পেরেই অসুখে, হিংসায় স্বার্থদ্বন্দ্বে সুখ খুঁজতে গিয়ে নিজেকে আরও অসুখী করে তোলে… আজ যে মার্টিন লুথারের জীবনী পড়ছিলাম, তাতে মনে হোল এক এক সময় এক-একজন ব্রাত্যমন নিয়ে পৃথিবীতে এসে শুধু যে নিজেই স্বাধীন মত ব্যক্ত করে চলে যায় তা নয়, জড়মনকেও বন্ধন-মুক্ত করে দেবার সাহায্য করে। যেমন সহস্র বৎসরের পুঞ্জীকৃত অন্ধকার এক মুহূর্ত্তের একটা দেশলাইয়ের কাঠির আলোতেই চলে যায় - তেমনি। কাউকে ঘৃণা করতে হবে না। এ জগতে যারা হিংসুক, স্বার্থান্ধ নীচমনা তাদের আমরা যেন ঘৃণা না করি… শুধু উচ্চ জীবনানন্দ তাদের দেখিয়ে দেবার কেউ নেই বলেই তারা ঐ রকম হয়ে আছে। কোন্ মুক্ত পুরুষ অনন্ত অধিকারের বার্ত্তা তাদের উপেক্ষিত বুভুক্ষাশীর্ণ প্রাণে পৌঁছে দেবে? ॥ ২৭শে অক্টোবর, ১৯২৪, কলিকাতা ॥

  • নমো তস্স । কৌশিক সরকার | Manikarnika.Pub

    নমো তস্স । কৌশিক সরকার বিষয় : নন-ফিকশন্ (বুদ্ধ-জীবনকথা) প্রচ্ছদ : ঋভু চৌধুরী প্রকাশনা : মণিকর্ণিকা মূল্য : ₹৩৫০ যোগাযোগ (কল ও হোয়াটস্অ্যাপ) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির একটি অংশ এখানে দেওয়া হল। সম্পূর্ণ বর্ষাকাল ভগবান ঋষিপত্তনের যে কুটিরে কাটিয়েছিলেন তাকে ‘মূলগন্ধকূটিবিহার’ বলা হয়। বোধিলাভের পর থেকে তিনি আজীবন যেখানে যে যে কুটিরে অবস্থান করেছিলেন সেই সব কুটিরকেই ‘গন্ধকূটিবিহার’ বলা হয়। সম্ভবত ভিক্ষুগণ ভগবানের কুটিরে পুষ্প প্রদান করতেন এবং সুগন্ধি দ্রব্য জ্বালতেন বলে এইরূপ নামকরণ হয়েছিল। আর ঋষিপত্তনের কুটিরে তিনি প্রথমবার অবস্থান করেছিলেন বলে হতে পারে তার নাম মূলগন্ধকূটিবিহার। এই কুটিরের ধ্বংসাবশেষ আজও বর্তমান সারনাথে বিদ্যমান। বারানসীতে যশ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠলেন। এমনিতেই সম্পন্ন পরিবার নিয়ে আলোচনা হয়, তার উপর হঠাৎ সন্ন্যাস গ্রহণ সকলকে কৌতূহলী করে তুলল। দাসদাসীদের মাধ্যমে প্রায় প্রত্যেক গৃহে যশ ও তথাগতকে নিয়ে আলোচনা শুরু হল। বারানসীর মানুষের ধারণা হল যে, ঋষিপত্তনে কে এক শ্রমণ গৌতম এসেছে, সে কী এক জাদু করে যশকে বশীভূত করেছে। কিন্তু শ্রমণ গৌতমের অনেক জাদু তখনও বাকি ছিল। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই যশের প্রভূত পরিবর্তন দেখে তাঁর চার বন্ধু প্রবজ্জা গ্রহণ করে ভিক্ষুসংঘে যোগদান করলেন। বর্ষাকাল শেষ হবার আগেই যশ ও তাঁর চার বন্ধুর আত্মীয়-পরিজন ও বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে থেকে আরও পঞ্চাশজন প্রবজ্জা গ্রহণ করলেন। সবমিলিয়ে ভিক্ষুসংঘে ভিক্ষুর সংখ্যা দাঁড়ালো ষাট। বারানসীবাসী এবার বলতে শুরু করলেন, শ্রমণ গৌতম সধবাদের তাদের স্বামী থাকা সত্ত্বেও বিধবা বানায়। বর্ষাকাল শেষের প্রাক্কালে একদিন ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ভগবান উপলব্ধি করলেন ধর্মের ব্যাপ্তি আরও বিস্তৃত করতে হবে। প্রবজ্জা গ্রহণকারী ভিক্ষুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিভিন্ন দিক থেকে ভিক্ষুগণ ধর্মের স্রোতে এসে মিলিত হচ্ছেন। অতএব এখন থেকে আমি শুধু একা প্রবজ্জা প্রদান করব না, বরঞ্চ আমি ভিক্ষুগণকে প্রবজ্জা প্রদানের অনুশাসন প্রদান করব। এখন থেকে ভিক্ষুগণ ভিন্ন ভিন্ন দিকে ভিন্ন ভিন্ন জনপদে চারিকা করবেন এবং মুক্তি অভিলাষী মানবকে সেই স্থানেই প্রবজ্জা প্রদান করবেন। ভগবান প্রবজ্জা গ্রহণের নিয়ম নীতিকে অতি সরলীকৃত করলেন। যিনি কর্মকাণ্ডে আস্থাবিহীন তাঁর পক্ষে এটাই স্বাভাবিক। নিয়ম নির্ধারণ হল যিনি প্রবজ্জা গ্রহণ করবেন তিনি স্নান সম্পন্ন করার পর তাঁর মস্তক মুণ্ডিত করে তাকে তাৎক্ষণিক দুই খণ্ড চীবর (এক খণ্ড দেহের উপরিভাগের জন্য এবং অপরটি নিম্নাঙ্গের জন্য) এবং একটি ভিক্ষাপাত্র প্রদান করা হবে। তিনি সমবেত ভিক্ষুগণের সামনে হাঁটু ভাঁজ করে বসবেন এবং দুই হাত বুকের কাছে নিয়ে এসে করজোড়ে বলবেন- বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি ধম্মং শরণং গচ্ছামি সংঘং শরণং গচ্ছামি এইরূপ দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বার ত্রিশরণ গ্রহণ করবেন। অতঃপর ধ্যান ভঙ্গ হলে ভগবান ভিক্ষুগণকে ডেকে বললেন- চরথ ভিক্খবে চারিকং বহুজনহিতায়, বহুজন সুখায়, লোকানুকম্পায় অত্তায় হিতায় সুখায় দেবমনুস্ সানং। হে ভিক্ষুগণ! বহুজনের হিতের জন্য, বহুজনের সুখের জন্য, দেবতা ও মানুষের কল্যাণের জন্য তোমরা দিকে দিকে বিচরণ করো। তোমরা সদ্ধর্ম প্রচার করো, যার আদিতে কল্যণ, মধ্যে কল্যাণ এবং অন্তে কল্যাণ, যা অর্থযুক্ত, ব্যঞ্জনযুক্ত ও পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য প্রচার করো। ভগবান বললেন, ‘আমিও বসে থাকব না, আমি আবার উরুবেলা অভিমুখে যাত্রা করব এবং কল্যাণকারী সদ্ধর্ম প্রচার করব।’ এইভাবে বর্ষাকাল সম্পন্ন হবার পর ভিক্ষুগণ বিভিন্ন জনপদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন এবং তথাগত স্বয়ং আবারও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে উরুবেলা অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেন। চলতে চলতে একদিন পথ প্রান্তে এক বৃক্ষের নীচে উপযুক্ত স্থান মনে করে ধ্যানমগ্ন হলেন ভগবান। কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর কিছু যুবকের ডাকে ভগবানের ধ্যান ভঙ্গ হল। তিনি চোখ মেলে তাকালে যুবকরা একযোগে উত্তেজিত স্বরে জিজ্ঞেস করল- হে শ্রমণ, আপনি কি এই পথ দিয়ে কোনো স্ত্রীলোককে যেতে দেখেছেন? ভগবান সর্বজ্ঞ, তবুও তিনি কৌতুক ও স্নেহার্দ্র কন্ঠে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন- ‘তোমরা নিজেকে না খুঁজে অপরকে খুঁজছ কেন?’ একে তো এরকম সাংঘাতিক প্রশ্ন, তার ওপর সামনে এক শান্ত, সৌম্য সন্ন্যাসী, সব মিলিয়ে যে মানসিক প্রতিক্রিয়া হল তাতে যুবকেরা চোখ নামিয়ে বলল যে তারা এই জঙ্গলে প্রমোদভ্রমণে এসেছিল। সঙ্গে ছিলেন এক বারাঙ্গনা। গত রাত্রে প্রমত্ততার পর সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সেই বারাঙ্গনা তাদের সমস্ত ধনরাশী ও দামি আভূষন নিয়ে পলায়ন করেছে। তাই তারা আজ সকাল থেকে সেই স্ত্রীলোককে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কয়েক মূহুর্ত নিশ্চুপ থেকে তথাগত উপদেশ দিলেন- যা গেছে তা অতীত, যাকে খুঁজছ তা ভবিষ্যৎ, পাবে কিনা জানো না, ভবিষ্যত অনিশ্চিত, অতীত দুঃখময়, তার জন্য বর্তমানকে নষ্ট করছ কেন? বললেন, ‘তোমাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে অতীত দুঃখময় কেন?’ অতীতে তো অনেক সুখস্মৃতি আছে। কিন্তু সেই সুখ আজ আর নেই বলে দুঃখের জন্ম হচ্ছে। ভবিষ্যৎ আশঙ্কাময় ও অনিশ্চিত। সুখ একমাত্র বর্তমানেই আছে। তাই বর্তমানে মনোনিবেশ করো। এতক্ষণ পর যুবকরা এই তেজোদীপ্ত শ্রমণের দিকে ভালো করে তাকাল। মনে হল সকালের নতুন সূর্যের প্রভায় শ্রমণ জোতির্ময় রূপ ধারণ করেছেন। তারা কি বুঝল কে জানে কিন্তু নিশ্চুপ হয়ে নতমস্তকে নমস্কার করে বিদায় গ্রহণ করল। তথাগত ডান-হাত তুলে চৈতন্য মুদ্রায় আশীর্বাদ করলেন। এটাই তথাগত বুদ্ধের বৈশিষ্ট্য। তিনি যখনই সুযোগ পেয়েছেন সৎ গুণ, সৎ চিন্তা, সদাচার, সদ্ধর্মের স্ফুলিঙ্গ জ্বালানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এ বিষয়ে এক বয়স্ক ব্যক্তির কাছ থেকে শোনা তাঁর জীবনের গল্প বলি। বহুদিন আগে তিনি তখন গ্রামের এক বাড়িতে মা, স্ত্রী, ছোট ছোট দুই সন্তান ও অবিবাহিত বোনকে নিয়ে বাস করতেন। একদিন প্রবল ঝড়বৃষ্টির রাত্রে প্রচণ্ড জোরে বজ্রপাত হল। তিনি বললেন আমার এই জীবনে এত জোরে বজ্রপাতের শব্দ আর শুনিনি। মনে হল বাজটা বাড়ির আশেপাশেই কোথাও পড়েছে। বৃষ্টি থামলে তিনি হাতে লন্ঠন নিয়ে বেরোলেন দেখতে যে বাজটা ঠিক কোথায় পড়েছে। দেখলেন গ্রামের আরও কিছু মানুষ বেরিয়েছে ওই একই উদ্দেশ্যে। কিন্তু না, অনেক খুঁজেও বজ্রপাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। এমনকি পরের দিন সকালেও অনেক খুঁজে কোনো চিহ্ন পেলেন না। মাস চারেক বাদে হঠাৎ একদিন উঠোনের নারকেল গাছটা ভেঙ্গে পড়ল। দেখলেন গাছটার ভেতরটা পুড়ে কালো ও ফোপড়া হয়ে গেছে। তখন বুঝতে পারলেন সেই রাত্রে বজ্রপাত এই গাছটার উপরেই হয়েছিল। ঠিক সেরকমই কোনো সিদ্ধ যোগী বা বোধিপ্রাপ্ত ব্যক্তির সামনে দাঁড়ালে আমাদের ভেতরে ওই বাজ পড়ার মতো অজানা কিছু ঘটে। আমরা সেই মুহূর্তে কিছু না বুঝলেও অন্তর শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়া সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হয়ে যায়। বহুসময় পরে হলেও একদিন না একদিন তাঁর চিত্ত পূর্ণ শুদ্ধ ও প্রজ্বলিত হয়ে আলোকরূপী অনন্তের সঙ্গে মিলিত হবেই।

  • সর্জন । পল্লব দাস | Manikarnika.Pub

    সর্জন । পল্লব দাস বিষয় : গল্প সংকলন প্রচ্ছদ : শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশনা : মণিকর্ণিকা প্রকাশনী মূল্য : ₹ ২০০ যোগাযোগ (কল ও হোয়াটস্অ্যাপ) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির কিছু অংশ এখানে দেওয়া হল। কোভিডকালে অনেকের মতোই ঘরবন্দী হয়ে পড়েন মিহির। এই সময়কালে তার মধ্যে ছবির মতো ভেসে উঠতে থাকে অতীতকালের চরিত্ররা। বাবা, মা, ঠাকুমা, বন্ধু, গোল্ডস্পট, বিগফান- একটা একটা করে ঘটনার ছবি সংগ্রহবাক্সে জমাতে শুরু করেন মিহির। একদিন সেই বাক্সের ঢাকনা খুলে পি সি সরকারের ওয়াটার অফ ইন্ডিয়ার মতন টান দিলেন সংগ্রহের ছবিগুলির কোণা ধরে। জলের মতন পড়ার বদলে তারা ঘুরতে লাগল হাওয়ায়, তার চারপাশে। প্রতিটি জীবন্ত ছবি, সিনেমার মতন। তিনি কলমের খোঁচায় একটি করে গেঁথে আটকে দিতে থাকেন খাতার পাতায়। এক একটি ছবি হয়ে যায় শব্দের রাশি। শব্দ দিয়ে তৈরি হয় একটার পর একটা গল্প— তার নিজের গল্প। মিহিরের গল্প। মিহির জানেন, এসবই তার জীবন, তার অতীত, তার বর্তমানজুড়ে লেখা। এ বই আসলে আয়নার মতন।

  • আমার লাল সাইকেল - প্রিবুকিং | Manikarnika.Pub

    আমার লাল সাইকেল । অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী (গল্প) ক্লাস টুর ছাত্র, গলুর চোখ দিয়ে লেখা হয়েছে এই চারটি গল্প। সে নিজেকে কীভাবে দেখে, নিজেকে কী ভাবে, চারপাশ নিয়ে, পরিবেশ নিয়ে, তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তার ভাবনাচিন্তা এখানে সে ব্যক্ত করেছে। বাচ্চা আসলে কার দলে, বাবা না মায়ের সেই নিয়েও নানান মজার উপস্থাপনা আছে। সে গাছ, পাখি, ফুল ভালবাসে। কিন্তু বর্তমান ক্রমবর্ধমান নগরায়নে সে কিভাবে তার মনের বিকাশ বাধাহত হচ্ছে, সে আহত হচ্ছে, একথাই বলা আছে গল্পে গল্পে। আর আছে বাচ্চাটির বাবার চরিত্র। এ নতুন নতুন নামে তার শিশুটিকে ডাকে, তাকে গাছপালা, প্রকৃতি চেনায়। তার বাবা-ই তার প্রকৃত বন্ধু। গলু আসলে কার দলে? তার বাবার দলে না মায়ের দলে? নাকি সে এই দলাদলিতে অভ্যস্ত? নাকি সে ক্ষণে-ক্ষণে দল পাল্টায়? জানতে গেলে পড়তেই হবে গলুর এই আত্মজীবনীখানা- আমার লাল সাইকেল। Prebook Now আমি একটা পাহাড় কিনব ________________________ ঠিক হল, একদিন আমি আর বাবা মিলে শিশির পড়া দেখতে যাব। কিন্তু মাকে বলা যাবে না। কারণ তাহলে মা যেতে দেবে না। কিন্তু মা ঠিক জেনে গেল। কী করে যে মা জেনে যায়, বাবা, আমি চুপিচুপি কোথায় যাচ্ছি— বুঝি না। মা অমনি বাধা দেয়। বলে, ‘এই ভর-সন্ধেতে ওকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?’ বাবা কেবল বলল, ‘এই একটু বাইরে যাব।’ মা বলল, ‘এখন শিশির পড়ছে। ওর ঠান্ডা লেগে যাবে। নিয়ে যাচ্ছ কেন? কী দরকার?’ বাবা আর কিছু বলল না। আমার হাত ধরে বেরিয়ে এল। রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকল। আমাদের পাড়ার রাস্তা। শুনতে পাই, পিছনে মা গজগজ করছে, ‘কথা শুনল না, ছেলেটাকে নিয়ে গেল। কুয়াশা লেগে শরীর খারাপ হলে— তখন? সেই আমাকেই তো রাত জেগে মাথার গোড়ায় বসে থাকতে হবে।’ রাস্তা দিয়ে খানিক হেঁটে বাবা নেমে এল। এখানে অন্ধকার। এখানে আছে মাঠ। মাঠে আছে ঘাস। ঘাসের রং সবুজ। ঘাসের ভেতর নামল বাবা। বলল, ‘আয়।’ আমি বাবার পাশে গিয়ে চুপটি করে দাঁড়ালাম। একটু যে ভয় করছে না, তা নয়। এমনিতেই রাতের বেলায় কখনও আসিনি কিনা! তবে বাবা আছে তো, ঠিক সামলে নেবে। বাবা আমাকে মাঝে মাঝে বলে, ‘অন্ধকারকে চিনতে হয়।’ এবারে বাবা বলল, ‘এবার বোস। উবু হয়ে বোস। আমার মতন করে দ্যাখ—’ বলে বাবা নিজেই উবু হয়ে বসল। আমিও বসলাম দেখাদেখি। বললাম, ‘হয়েছে?’ বাবা বলে, ‘হ্যাঁ।’ আমি বলি, ‘এমনি করে আমি বসি, ইস্কুলে যখন পিটি হয়।’ বাবা বলে, ‘এবার নে, ঘাসের গায়ে হাত দে।’ আমি হাত দিই। কী নরম ঘাস! কী সুন্দর ঠান্ডা-ঠান্ডা! বেশ লাগে। বাবার সঙ্গে বেরুলে কত কিছু জানা যায়। বাবা বলে, ‘ঘাসের গায়ে হাত দিচ্ছিস?’ আমি বলি, ‘দিচ্ছি বাবা।’ ‘কী বুঝছিস?’ ‘কী বুঝব?’ ‘ঘাস ভিজে না?’ ‘ভিজে তো!’ ‘হাত ভিজে যায়?’ ‘যায় তো!’ ‘জেনে রাখ, এই হল শিশির।’ ‘শিশির… শিশির— আহা! তুমি কাঁদছ বাবা?’ ‘না রে। কাঁদব কেন?’ ‘আমার মনে হল, তুমি কাঁদছ!’ ‘দূর পাগল!’ ‘তুমি ডাব খাবে বাবা।’ ‘খাব।’ ‘তুমি টোটো চেপে যাওয়া আসা করবে বাবা।’ ‘করব।’ ‘আমি তোমায় পয়সা দোব।’ ‘তুই পাবি কোত্থেকে?’ ‘বারে! বড় হয়ে জেঠুর মতো আমিও বড়ো চাকরি করব। লন্ডন যাব। সেখানে গিয়ে একটা পাহাড় কিনব। তাতে মেপল গাছ পুঁতব একখানা। সেই গাছে খুঁটোবাঁধা হাঁস এসে বসবে। তোমাকে আর মাকে সেখানে নিয়ে যাব।’ অমনি বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে। কপালে চুমু খায়। আমি বাবার বুকে মাথা রেখে চোখ বুজে আদর খাই। Prebook Now

  • Prebk : Ek Puchke Kalo Macher Golpo | Manikarnika.Pub

    এক পুঁচকে কালো মাছের গল্প মূল গল্প : সামাদ বেহরাঙ্গী অনুবাদ : সৈকত ভট্টাচার্য বুক করুন ২০% ছাড়! Book Now ‘এক পুঁচকে কালো মাছের গল্প’ – বইটি সামাদ বেহরাঙ্গির ‘দ্য লিটিল ব্ল্যাক ফিশ’-এর অনুবাদ। এই অনুবাদটি করেছেন লেখক সৈকত ভট্টাচার্য্য। মূল বইটি একটি রাজনৈতিক রূপক। বইটি দীর্ঘদিন ইরানে নিষিদ্ধ ছিল। একটি বৃদ্ধ মাছ, তার সমস্ত সন্তান, নাতি-নাতনিদের গল্প শোনাচ্ছে। স্থানীয় স্রোতের নিরাপত্তা ছেড়ে কিভাবে একটি কালো মাছ নিজের উদ্যমে বিশ্বের বিরাট স্রোতের মধ্যে এসে পৌঁছয়, তার গল্প। একটি জলপ্রপাতের নিচ থেকে নদীর দৈর্ঘ্য বরাবর সমুদ্রের দিকে যাত্রা করে কালো মাছ। সেই পথে দেখা হয় টিকটিকি এবং ভয়ংকর পেলিকানসহ বেশ কয়েকটি আকর্ষণীয় চরিত্রের সঙ্গে। প্রখর বুদ্ধি এবং সাহস থাকলে যে অনেক কঠিন পথ অতিক্রম করা যায়, সেই গল্পই শুনিয়েছেন বৃদ্ধ মাছ। কালো মাছটি নিজেই সমস্ত মাছেদের জন্য এক অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল। মুদ্রিত মূল্য : ₹ ২০০ ডিসকাউন্ট মূল্য : ₹ ১৬০ শিপিং : ₹ ৫৯ প্রচ্ছদ : শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় মণিকর্ণিকা প্রকাশনী Call & WhatsApp : 8240333741 Book Now ❛ বিশাল সমুদ্রের একদম তলায় ছিল এক খুনখুনে বুড়ি মাছ। বারো হাজার ছানাপোনা, নাতি-নাতনিদের নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। শীতের বেজায় লম্বা রাতগুলোতে যখন অন্ধকারের কালো চাদর ঢেকে রাখত চারদিক, বুড়িকে ঘিরে সবাই মিলে বসত গল্প শুনতে। এমন এক রাতে বুড়ি গল্প বলছিল: অনেক অনেক দিন আগের কথা। একটা ছিল মস্ত বড়ো পাহাড়। আর সেই পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছিল একটা ছোট্ট পুকুর। পুকুরের জলে থাকত একটা পুঁচকে কালো মাছ আর তার মা। শ্যাওলাধরা একটা কালো বড়ো পাথরের তলায় ছিল মা-মেয়ের ঘর। পুঁচকে মাছটা ওই পাথরের তলায় শুয়ে অপেক্ষা করে থাকত কবে তাদের ঘরে এক চিলতে চাঁদের আলো এসে পড়বে। সকাল থেকে সন্ধে অবধি মায়ের পিছন পিছন এদিক ওদিক সাঁতার কেটে দিন কাটত তার। মাঝে মাঝে আশপাশের অন্য মাছের দলের সঙ্গ জুটে যেত। সবাই মিলে হইহই করে পাথরের ফাঁক ফোকর দিয়ে চলত সুড়ুৎ সুড়ুৎ সাঁতার। পুঁচকে কালো মাছটা ওর মায়ের একমাত্র মেয়ে। আরও প্রায় দশ হাজার ভাইবোনের সঙ্গে ডিম ফুটে জন্মেছিল সে। কিন্তু ও ছাড়া বাকি আর কেউ বাঁচেইনি। কিছুদিন ধরেই পুঁচকে মাছ বেশ চুপচাপ। গম্ভীর হয়ে মায়ের পিছনে আস্তে আস্তে ঘুর ঘুর করে বটে, কিন্তু অন্য বন্ধুবান্ধবদের বিশেষ পাত্তা-টাত্তা দেয় না। তাদের সঙ্গে খেলছেও না আজকাল। মা ভাবল মেয়ের বুঝি শরীরটা ভালো নেই। ঠিক হয়ে যাবে শিগগিরই। কিন্তু আসলে যে সমস্যাটা অন্য জায়গায় সেটা তার মা ভাবতেও পারেনি। একদিন সক্কালবেলা যখন সূয্যিমামারও ঘুম ভাঙেনি, ছোট্ট মাছ ঘুম থেকে উঠে মাকে ঠেলা দিয়ে ডেকে বলল, মা, শুনছ? তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে। মায়ের তখনও পুরো ঘুম ভাঙেনি। ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করল, কী আবার কথা? এই সক্কাল সক্কাল? তার চেয়ে বরং চল আমরা এক পাক সাঁতার কেটে আসি। না, মা। আমি সাঁতার কাটতে যাব না। আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি। চলে যাচ্ছিস? হ্যাঁ। আমায় যেতেই হবে। কোথায় যাবি তুই? এই সাত সকালে? এই পুকুর থেকে বেরিয়ে জলের ধারাটা বয়ে কোথায় যায় আমি দেখতে যাব। জানো মা, আমি ভাবার চেষ্টা করছিলাম যে এই এত জল সব যায় কোথায়? ভেবে ভেবে সারারাত ঘুমাইনি। কিন্তু কিছুই ভেবে পেলাম না। তাই আমি বেরিয়ে পড়ব ঠিক করেছি—এই পুকুরের জল বের হয়ে কোথায় যায়, সেটা দেখতে চাই। আরও অন্য অন্য জায়গা দেখতে ইচ্ছে করে, বাইরের দুনিয়ায় কী কী হয় সেইসবও জানতে ইচ্ছে করে আমার।... ❜

  • সুবাসিত বিষাদেরা গান গায় । শুচিশ্রী রায় | Manikarnika.Pub

    সুবাসিত বিষাদেরা গান গায় । শুচিশ্রী রায় বিষয় : ব্যক্তিগত গদ্য প্রচ্ছদ : গার্গী চৌধুরী নামাঙ্কণ : শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় মণিকর্ণিকা প্রকাশনী মূল্য : ₹ ২২০ যোগাযোগ (Call or Whatsapp) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির একটি অংশ এখানে দেওয়া হল। হারানো দুপুরবেলার পটদীপ মুলতানি ভীমপলাশিরা শীত আর গরমের লম্বা ছুটির দিনগুলোর কথা ভেবে মনকেমন করে। আমাদের দোতলা বাড়ির একতলার বড়ো ঘর যেটা কিনা আমার আঁকা শেখার, অঙ্ক কষার, আর পরের দিকে রেওয়াজের জন্য নির্দিষ্ট ছিল, তার গা লাগোয়া লম্বা বারান্দার পরে হাত দশ চলন রাস্তার গায়েই বাড়ির পাঁচিল। পাঁচিলে ঠেসান দিয়ে একটা লম্বা ক্রোটন গাছ, ফুরুস ফুলের গাছ, আর ডবল টগরের গাছ। বারান্দার সীমানায় দুহাত উঁচু ইটের দেয়াল শুরু থেকে শেষ অবধি। রাস্তায় এসে গাছের আড়াল থেকে মুন্না ডাক দিত নরম গলায় ‘বৈকালি, এই বৈকালি’। ও একাই কেবল এই নামে চিনত আমায়। বিকেলে জন্মেছিলাম তাই জেঠু নাম রেখেছিলেন ‘বৈকালি’। সময়ের সঙ্গেসঙ্গে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের জটিলতায় আমার খুব পছন্দের সে নাম হারিয়েই গেছে আজ। মুন্নাদের বাড়ি আমার বাড়ির বাঁ-হাত ধরে এগিয়ে গিয়ে দুটো বাড়ির পরে ডানদিকে মানে ইংরেজি এল এর মত গেলে তার শেষপ্রান্তে। ও কলকাতায় মনোহরপুকুরে মামাবড়িতে থেকে পড়াশুনো করত আর তাই ইস্কুলের ছুটিগুলোতে সুযোগ পেত মা বাবা ভাই এর সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটিয়ে যাবার; আর হ্যাঁ আমাকে বড্ড ভালোবাসত। গায়ের রং কালো বলে মুন্নাকে নানাজনের কাছে নানান কথা শুনতে হত তাই মনের মধ্যে অনেক কষ্ট। ওর মিষ্টি ঠাণ্ডা স্বভাব, চিকণ মুখ আর মা কালির মতো ঢেউ খেলানো একপিঠ চুল সব আমার খুব পছন্দের ছিল। আমার মাথায় বরাবর ফুরফুরে কিন্তু বিশ্বস্ত কয়েক গাছি, বিশ্বস্ত কারণ এতদিনেও তারা আমাকে ছেড়ে যায়নি! মুন্নাকে জানালার ধারে বসিয়ে আমি রিয়েল স্টাডি করতাম। খুঁজে দেখলে সেই আঁকার খাতা এখনও পাওয়া যেতে পারে। দুপুর যেই হেলান দিত বিকেলের গায়ে মানে এই তিনটে সাড়ে তিনটে নাগাদ মুন্নার গলার হাতছানিতে আমি ঘরের দরজা খুলে বারান্দার পাঁচিলে এক পা তারপর শূন্যে এক লাফ দিয়ে বড়ো পাঁচিলে অন্য পা ছুঁয়েই জোড়া পায়ে ইট বাধানো রাস্তার ওপর লম্ফ দিয়ে পড়ে ‘চল’ বলে দৌড় লাগাতাম ব্যাঙার বাগানের দিকে। নিপাট ভালো শান্ত মেয়েটা আমার মতোত ডানপিটের পিছু পিছু ছুটে হাঁপিয়ে একশা হত। ব্যাঙার বাগানে বিরাট বিরাট লিচু গাছে টিনের খালি ক্যানেস্তারার ভেতর ইটের ছোটো টুকরো ভরে লম্বা দড়ি দিয়ে টাঙানো থাকতো। ভাম বা হনুমানের আনাগোনা হলেই মাটিতে চাটাই বিছিয়ে শুয়ে থাকা পাহারাদার দড়িতে টান দিয়ে বেজায় বিশ্রী ঢং ঢং শব্দ করতো যাতে ওরা ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়। মাঝরাতে বিছানায় শুয়ে বহুদিন ওই কদাকার শব্দ কানে এসেছে। এত গাঢ় ঘন গাছপালা ঘেরা সেই বাগান যে রোদ্দুর আসত ছেঁড়া ছেঁড়া আর গাছপালার মাঝখানে ছোট্ট একটু গোলাকার ঘাস ওঠা ন্যাড়া জমিতে আমরা ছুটোছুটি সেরে নিতাম, তারপর ফলসা গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসে তেঁতুল খেতাম। গাছের গোড়ায় ঊর্ধ্বমুখী তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত মুন্না, ‘বৈকালি আমাকে উঠিয়ে দিবি রে’? সঙ্গী পাড়াতুতো দাদাদের কেউ কেউ দয়াপরবশ হয়ে ওকেও উঠিয়ে নিত গাছে। আমার দুই পা ফলসা গাছের ডালের দুদিকে দুলতে থাকতো আর তার ছায়া দেখা যেত নীচের ডোবায়। এখন সেই ছায়াও নেই আর ডোবাও নেই আছে কেবল আমার এই ডুবুরি সত্তা। যতক্ষণ শ্বাস জমিয়ে রাখতে পারি কখনও সেই জলে কখনও সেই জঙ্গলে ঘুরি ফিরি, বেঁচে থাকি। গা এলানো বিকেলগুলো হাততালি দেয় লম্বা নারকেল গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে যার গোড়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিল ফ্যালন। পাড়ার মানুষকে অতীষ্ঠ করে রেখেছিল তার চুরি বিদ্যার মহার্ঘ্যে। আহা বেচারা ডাব চুরি করে ঘুমিয়ে গেছিল আর পাড়ার ছেলেরা ধরে কী মারই না মারল! কোনো এক বড়োসড়ো চুরির পরে মার খেয়ে মরেই গেল ফ্যালন। কালোকোলো আঁটসাঁট চেহারা তার দিব্য মনে আছে আমার। আজ এই বয়েসের বিকেলগুলো একঘেয়ে আর মনমরা। গোধূলির সেই মায়াময় আলো আর নেই। চাল-ধোয়া ঘোলা রঙের আকাশে দুপুর কখন পিছলে গিয়ে বিকেলের বাস্তুতে হাজির হয় জানতেও পারিনা। একরাশ হারিয়ে ফেলা দুপুর ভীমপলাশির মত অভিমানী আর মরমিয়া। মরমিয়া, শঙ্খর খুকির নাম, ভারি মোলায়েম। ভীমপলাশির সুরে অনেক ভজন বাঁধা হয়েছে, এমনকি ভীমপলাশি রাগের উপস্থাপনাতেও ভক্তি ভাবই মুখ্য - অন্তত আমি যেটুকু শুনেছি বা শিখেছি তা দিয়ে বলতে পারি। আমি ভক্তি আলাদা করে বুঝি না মানে অনেকটা ‘তন্ত্র-মন্ত্র জানি নে মা’ গোছের। আমি বুঝি প্রেম, ভালোবাসা, আর অন্তরের সম্পূর্ণ সমর্পণ। ভালোবাসার সঙ্গে শ্রদ্ধাবোধ জড়িয়ে থাকে, ভয় কেন থাকবে? থাকবে সম্ভ্রম কারণ আমি এই বিশ্বাসেই থাকতে ভালোবাসি যে তিনি মায়ের মতোই ক্ষমাশীল। সেই যে মা সারদা বলেছেন - সন্তান ধুলো মাখলে তার গায়ের ধুলো পরিষ্কার করে কোলে তুলে নেওয়াই মায়ের কাজ। আমার ভিতর সেই মা আর সন্তান একসঙ্গে বেঁচে থাকুক এই আমার চাওয়া, তাই ভীমপলাশিকেও আমার মতন করেই আপন করেছি। সে নরম। বৃষ্টি ভেজা মাটির মতো অভিমানি, আলতো চাপেই টোল খেয়ে যায়। ভীমপলাশি শান্ত রাগ। নিজের কষ্ট সে গোপন রাখতে ভালোবাসে। কোমল গা, কোমল নি ঘুরে হাল্কা শুদ্ধ ধৈবত ছুঁয়ে শুদ্ধ মধ্যমে এসে দাঁড়িয়ে যায়। তারপর আস্তে আস্তে পঞ্চম ছোঁয়। দাদিয়ার (আমার ঠাকুরদা) বাড়িতে জেঠুর কেনা একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। আমরা তুতো-ভাইবোনেরা উৎসবের দিনগুলোতে একসঙ্গে হলেই দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই মিলে ওই রেকর্ড প্লেয়ারের ওপর ঝুঁকে পড়তাম। দাদাভাই একমাত্র জানত গোল চলন্ত চাকতির ওপর চাটুর মত রেকর্ড চাপিয়ে টুথব্রাশের মতন জিনিসটা আলতো করে রেকর্ডের কানা ঘেঁষে কেমন করে বসিয়ে দিতে হয় আর সঙ্গে সঙ্গে গান বাজতে শুরু করে। সেই দুপুরগুলো মনে পড়ে। “আমার সাধ না মিটিলো আশা না পুরিলো সকলই ফুরায়ে যায় মা” - পান্নালাল ভট্টাচার্যের গলায় এই গান শুনে তখনও আমার গলা বুজে যেত। আহা কী দরদ, কী প্রেম, কী মায়া সে গলায়! ঠাম্মারা পানের ডাবা নিয়ে পা ছড়িয়ে বসে গল্পে মজতেন। এলো করে শাড়ি পরা ঠাম্মার গায়ের রং ছিল ধবধবে। মুখে পান, বাংলাদেশি বুলি। আর রান্না? হাত চেটে চেটে ফর্সা করে ফেলতাম সেই রান্নার গুণে। আমায় ডাকতেন ‘মামণি আমার সুনা (সোনা)।’ সব দুপুরবেলাগুলো হারিয়ে গেছে। কত সহজ, সামান্য আর আনন্দময় নিশ্চিন্তির দিন সেসব। সেইসব ভালোবাসার মানুষজনের গায়ের গন্ধ পাই দুপুরের ভীমপলাশিতে। মনে হয় কতদিন তারা নেই। অসহায় অক্ষম আমি মনকেমন করা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারি না তাদের তর্পণে। বাবা-মাও একদিন এভাবেই ভীমপলাশিতে মিশে যাবেন। কুট্টুস মিঠাই, একদিন আমিও। পান্নালালের সেই গানটিও ভীমপলাশির সুরেই। শীতের দিনগুলোয় বাড়ির ছাতে মাদুর বিছিয়ে লেপ গরম করতে দেওয়া হত। রোদ হেলে পড়ার আগেই ভাঁজ করে ঘরে এনে চাদর দিয়ে ঢেকে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমার। কনকনে রাতে একলাফে বিছানায় উঠে সেই লেপ খুলে গায়ে দিলে রোদের মিষ্টি গরম ওম পাওয়া যেততার ভাঁজে ভাঁজে। সেই রাজসিক ঘুমের কোনো বিকল্প হয় না। দুপুরের খাওয়া মিটিয়ে কমলালেবু আর অঙ্কের খাতা - দুই চরমপন্থিকে সঙ্গে নিয়ে লেপের ওপর গড়াগড়ি খেতাম। মাথার ওপর ঝকঝকে নীল আকাশের এপ্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে উড়ে যেত লম্বা ধোঁয়ার লেজওয়ালা জেট প্লেন। মায়ের হাতে উল কাঁটা থেকে ঝোলা অর্ধেক বোনা সোয়েটার, কোলে তারাশঙ্কর, পিঠে কোঁকড়ানো চুল মেলে রাখা। মায়ের বাঁ-হাতের তালু খুব নরম ছিল, আমার কপালে ছোঁয়ালেই ঘুমিয়ে পড়তাম। তখন মোবাইল ফোনের যন্ত্রণা ছিল না। পিয়োনের সাইকেলের ঘন্টি শুনলেই বুঝতাম নানাজির চিঠি এসেছে। শীতের দুপুর খুব জলদি ফুরিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ধোঁয়া ধোঁয়া স্যাঁতস্যাঁতে আর মনমরা হয়ে যায় সবকিছু। এখন খুপরি ফ্ল্যাটে এসির ঠাণ্ডায় বসে বারোমাস এই শহরের মাথার ওপরের ফ্যাকাশে আকাশ দেখায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিটোল, টিকিট মারা গাঢ় কমলা রঙের লেবু ইচ্ছে করলেই আজকাল সামনে হাজির হয়, তারপরেও কেন যে সেই ছোটো ত্যাবড়া অথচ মধুর মত মিষ্টি কমলালেবুর গন্ধ ভেসে আসে বুঝি না। আমার বয়েস হচ্ছে। এই যে টুক করে ঝলমলে একটা দুপুর শীতল নিষ্প্রাণ অন্ধকার সন্ধের গভীরে তলিয়ে গেল কিছুমাত্র বুঝতে না দিয়ে তাতেই বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে। জলের নীচে বালি যেমন সরে সরে যায় অজান্তে তেমনই অনেক কিছুই যেন সেই অনাকাঙ্ক্ষিত শীতলতার মধ্যে ডুবে যায়। হারিয়ে যাবে, যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত। এরকম কত কত মানুষের কত সহস্র দুপুরবেলা হারিয়ে গেছে। সকাল দুপুর সন্ধে সবই আজকাল একরকম। ব্যস্ত, বিরক্ত বিবর্ণ হতাশ ফেসবুকময় আর উৎকণ্ঠার। রবীন্দ্রনাথ সংগীতচিন্তার ছিন্নপত্রাবলীতে ইন্দিরা দেবীকে রাগ মুলতানি বিষয়ে বলছেন - ‘... আজ আমি এই অপরাহ্ণের ঝিকমিকি আলোতে জলে স্থলে শূন্যে সব জায়গাতেই সেই মূলতান রাগিণীটাকে তার করুণ চড়া অন্তরা-সুদ্ধ প্রত্যক্ষ দেখতে পাচ্ছি-না সুখ, না দুঃখ, কেবল আলস্যের অবসাদ এবং তার ভিতরকার একটা মর্মগত বেদনা”। মহৎ প্রাণের ব্যথাবোধ অবর্ণনীয় কিন্তু ক্ষুদ্র প্রাণীও তো কষ্ট পায়, যদিও সে হয়তো জগতের উত্থান-পতনের খেলার বিশিষ্ট পদাধিকারী নয়, কিন্তু এই ভুবনজোড়া কর্মকাণ্ডের ভাগীদার তো বটে! তার ব্যথাতুর নগণ্য শ্বাসপ্রশ্বাসও বাতাসকে ভারী করে, মুহূর্তে অতীত হতে থাকা বর্তমানকে স্মরণ করতে শেখায়। যা কিছুই পড়ে থাকে ‘সুখ নয় সে দুঃখ সে নয় নয় সে কামনা’। সে যে কিসের হাহাকার তা আমি জানি না। মুলতানিকে ‘সাঁঝ কি টোড়ি’ অর্থাৎ সন্ধ্যাবেলার টোড়ি বলা হয় কারণ এর সপ্তকে ভোরের রাগ টোড়ির মতনই রেখাব ধৈবত কোমল আর মধ্যম তীব্র কিন্তু তার জীয়ন কাঠিটি লুকিয়ে রাখা কোমল রে আর কোমল ধা-এর প্রয়োগ-কৌশলে। কুমারমামা বলতেন - ‘খুউব ডেলিকেট’। টোড়ি ঠাটের রাগ মুলতানি। অবরোহণে কোমল ধা আর কোমল রে খুব আলতো ভাবে আর অল্প সময়ের জন্য প্রয়োগ হয়, ‘পা ধা(কোমল)প’ বা ‘সা রে(কোমল)সা’ এই সঙ্গতিতে আর তাতেই পড়ে আসা বিকেলের ক্ষয়ে যাওয়া রূপটি যথার্থ ফুটে ওঠে। ‘লাল লাঠি’ খেলতাম আমরা, মাথায় একটা লম্বা লাঠি লম্বালম্বি শুইয়ে হেঁটে যেতে হত। সে এক অদ্ভুত মজার খেলা। গোটা পাড়া হেঁটে ছুটে মাতিয়ে রাখতাম। পাড়ার মধ্যিখানে বড়ো খোলা মাঠের এক কোণ থেকে কয়লা কালো মেঘ ঘনিয়ে ব্যাঙার বাগানের মাথা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ত। ক্ষণিকের মধ্যে গোবিন্দ জেঠুর বাড়ির লম্বা ক্রিসমাস ট্রি আর সুপুরি গাছের সারি দুলতে শুরু করলেই বাড়িমুখো ছুট লাগাতাম। ঘরে পা দেবার আগেই জলে ভিজে যেত গা-মুখ-মাথা। সেই জল এখনও গড়িয়ে পড়ছে কপাল চুইয়ে গাল বেয়ে আর ভিজে সপসপে হয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ কলকাতার হাইরাইসের দেয়াল, শপিং মলের পাপোশ, ভিক্টোরিয়ার পরি। মুন্নার বাবা মারা গেলেন বেশ কম বয়েসেই। সেসময় প্রতিটা দুপুর আমি ওদের বাড়ির ছাতে কাটাতাম। পুতুল কাকিমা, অসম্ভব শান্ত আর ঠান্ডা মানুষটা আরও শীতল আর নিশ্চুপ হয়ে গেছিলেন। মুন্নার মাথার চুল তেল ছাড়া রুক্ষ হয়ে যাচ্ছিল। মনে পড়ে ও শুকনো চোখে একমনে জমা খরচের হিসেব করত কারণ সংসার চালু থাকবার মতো ভরসা কোথাও ছিল না। এই সব সাধারণ তুচ্ছ পরিচিত ঘটনাগুলো জীবনের কোনো এক সময় অবলম্বন হয়ে পড়ে। জানলা দিয়ে সবুজ ময়দানের বুকে চরতে থাকা ঘোড়াগুলোর দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবি, ভাবতে ভাবতে এমন মনে হয় যেন এই সেদিন তো ঘটে গেল এইসব! সময়ের পাখা এক পলকে পুড়ে যায়। বিকেলের গায়ে হেলে পড়া দুপুরের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া মানুষজন, সময় আর অফুরান প্রাণশক্তি সব এক লহমায় ফিরে আসে পটদীপের শুদ্ধ নিষাদের সুরে। সুতীব্র আর তীক্ষ্ণ সেই নিষাদ অদৃশ্য নখের আঁচড় কাটতে থাকে বুকের গভীরে আর লাল রক্তের দাগ ফুটে ওঠে সেই জেট প্লেনের পিছনে ধোঁয়ার লম্বা লেজের মতো। তার সঙ্গেই চিনচিন করে ব্যথা হয়। চোখ ভারী হয়ে আসে। নিজেকে নিঃস্ব আর অসহায় মনে হয় আর সত্যি বলে যদি কিছু শব্দ আদৌ থাকে এই ধরাধামে তা হল অসহায়তা। ‘পথের পাঁচালী’ প্রথম কবে দেখি মনে নেই। এই এত বছরে আরও কতবার দেখেছি তাও গুণে বলতে পারব না। অভাবে জর্জরিত মলিন ভাঙা উঠোনে হরিহর বাক্স খুলে দুর্গাপুজোর উপহার বের করছেন একে একে। মুখে তার স্বস্তি আর সামান্য সাফল্যের হাসি। তার অপর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে সর্বজয়া, কোনো এক দাবানল যেন পুড়িয়ে কালি করে দিয়েছে তার মুখ। দামাল মেয়ে দুর্গার জন্য একটা শাড়ি এনেছেন হরিহর আর তিনি নিশ্চিত এই কাপড়ে তাকে ভারি সুন্দর মানাবে। ধ্বসে যাওয়া মাটির বাড়ির মতো মুহূর্তে হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়েন সর্বজয়া। তার ডুকরে ওঠা শরীর মাটিতে পড়ে থরথর করতে থাকে। স্তম্ভিত হরিহর মেয়ের মৃত্যুর কথা জেনে যান আর দুই মানুষের নির্বাক কান্নার পিছনে ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মত খানখান হয়ে বেরিয়ে আসে দক্ষিণা মোহন ঠাকুরের তারসানাই। রাগ পটদীপ। মন্দ্র সপ্তক থেকে গুমরে গুমরে ক্রমশ পাকিয়ে পাকিয়ে উঠতে থাকে আর রক্তাক্ত করতে করতে তা উড়ে চলে তার সপ্তকের দিকে। সে যে কী ভয়ঙ্কর! পৈশাচিক! পৃথিবীর সকল প্রজাতি - মানুষ জন্তু কীট - সকলের বিপন্নতার এক অনির্বচনীয় আর্তনাদ। সংগীত এতখানি পারে! এ একমাত্র সংগীতই পারে। আমি পটদীপকে ভয় পাই। কী জানি কোনো অজানা হাহাকার পঞ্চম থেকে শুদ্ধ নিষাদের মীড়ে আমাকে চুরমার করে দিয়ে যাবে এক লহমায়! ‘ত্রিবেণী তীর্থ পথে কে গাহিল গান’ - চিন্ময় লাহিড়ী আর প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবিস্মরণীয় সেই গান অথবা ‘প্রথম প্রদীপ জ্বালো মম ভবনে’ নজরূলের সেই গানে পটদীপ অন্য আঙ্গিকে ধরা দিয়েছে। এখানে তার সুতীব্র চিৎকার অনুপস্থিত। এভাবেই তো সময়, প্রেক্ষিত আর অভিমানের সামান্য এদিক সেদিকে প্রকৃতি বা মানুষের মত রাগের মন ও পালটে যায়। পালটে যায় তার কথা বলার ধরন, চাউনির দিশা, চলার ছন্দ। কাফি ঠাটের রাগ পটদীপ যদিও তার পাগল করে দেওয়া নিষাদটি শুদ্ধ। ছেলেবেলার দিনগুলো যে পথে হারিয়ে গেছে সেদিকেই হাঁটতে ইচ্ছে হয় আজকাল। শীতের দুপুরে পূজাবার্ষিকীর রঙিন মলাটে বিমল দাশের আঁকা ছবি, সন্দেশে নতুন শঙ্কুবাবুর অভিযান, কিশোর ভারতীর ভূতের গল্প সঙ্গে নিজের অনভ্যস্ত হাতে আঁকা এটা-সেটা, নড়বড়ে ছন্দে লেখা কবিতা এই সব কিছু নিয়ে নিরলস ভাবতে ভালো লাগে। ময়দানে একপাল ছেলে মেয়ে ফুটবল খেলছে। তার আগে তারা গোল হয়ে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে গান গায়। তাদের গায়ে রংবেরঙের জার্সি। ভেজা ঘাসের ওপর লম্বা হয়ে পড়ছে তাদের ছায়া, প্রত্যেকের ছায়া তাদের সঙ্গেসঙ্গেছুটে বেড়াচ্ছে সারা মাঠ। ঝাঁক বেঁধে উড়ে আসছে সাদা বক আর পায়রার দল। কিছুক্ষণের জন্য তারাও ঘাসের ওপর দম নিতে বসে। আমার অফিসের জানলা দিয়ে দেখা যায় সব। নানাজি বলতেন ‘আপিস’। টাক মাথা, দীর্ঘ সুঠাম চেহারার এক ভদ্রলোক পাশের উঁচু বাড়ির ছাদে প্রত্যেকদিন ঠিক দুপুরবেলা হনহন করে আধঘন্টা-টাক হাঁটেন। বৃষ্টিতেও দমেন না, ছাতা হাতে হেঁটে চলেন। হয়তো রোগব্যাধিবালাই দূর করতেই, কিন্তু আমার অবাক লাগে হাত-খানেক দুরেই কাঁচা সবুজ কার্পেটে মোড়া অমন একটা মাঠ থাকতে উনি ছাতের মেঝের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকেই কীভাবে যে সময়টা কাটিয়ে ফেলেন! যখন ভীমপলাশি, মুলতানি বা পটদীপ শিখেছি বুঝতেই পারিনি বাকি জীবনের প্রত্যেক দুপুরে একবার করে তারা কড়া নেড়ে দিয়ে যাবে এরা। যা কিছুই দেখি, যেসব ঘটনা কাগজে নয়তো টেলিভিশনের খবরের চ্যানেলের রোজ সন্ধের ঝালমুড়ি অথবা দিনের রাতের সমস্ত টুকিটাকি সব এই দুপুরের আলসেমির ছুতোয় মনখারাপের হাতচিঠি নিয়ে আসে। শহরের বেশিরভাগ আকাশ, যা আমার জানলা দিয়ে দেখা যায়, নিরন্তর বিমর্ষ থাকে। এই বর্ষায় দিগন্তের শেষ কিনারা থেকে কুয়াশার মতো বৃষ্টি এগিয়ে আসে, যত কাছে আসে তার শব্দ শোনা যায়। অতীত থেকে সেভাবেই ভেসে আসে সুর, গান, সখ্য, আর দুপুরবেলা। বুকের কাছাকাছি এলে তবে তার শব্দ শুনতে পাই। জীবনের অনেক হয়ত এখনও দেখার বাকি, তবু এই এক্ষুনি যদি স্তব্ধ হয়ে যায় সব, আমার কিছুমাত্র আফসোস থাকবে না। কত কিছুর মায়া, ভালোবাসা আর প্রাপ্তিতে পূর্ণ হয়ে আছি। এই যে আমার মনকেমন, এর জন্যেও তো নিজেকে প্রস্তুত করেছি, দুঃখই যদি না পেলাম তবে আর গানই শিখলাম কেন!

  • ধনপতির কথাপালা । মধুময় পাল | Manikarnika.Pub

    ধনপতির কথাপালা । মধুময় পাল বিষয় : গল্প প্রচ্ছদ: শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় মূল্য : ₹ ৪০০ মণিকর্ণিকা প্রকাশনী যোগাযোগ (কল ও হোয়াটস্অ্যাপ) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির একটি গল্প এখানে দেওয়া হল। বেজি এখানে রাত যখন গভীর হয়, সূর্য না উঠলেও পাতলা আলোর অ্যাসিডে অন্ধকার গলে যেতে থাকে। অন্ধকারের যে চ্যাটচেটে ভাব আছে, সেটা সহজে ছাড়ে না, চারপাশ তেতে একটু একটু করে পুড়ে যেতে থাকলে তখন পূর্ণ গভীর রাত। সেই চ্যাটচেটে ভাবের মধ্যেই মানুষজন ঘুমোতে ঘুমোতে ক্ষুদ্র হয়ে যায়, যেন জেগে ওঠার ইচ্ছে তাদের নেই, প্রয়োজন নেই, বরং অন্ধকারের বাইরে তাদের হাত বা পা বা মাথা চলে গেলে অবচেতনের তীব্র বিরক্তিতে গাঢ়তর অন্ধকারের আশায় পাশ ফেরে। এখানে ভোরের পাখি নেই, অভ্যাসবশত এসে-পড়া দু-চারটে কাকের ডাকারও স্পৃহা নেই, শুধু জল আসে ছরছরিয়ে, ভোরের ধার্মিকতা নেই, কেন না এখানে ধর্মপ্রচারকরা বাস্তবিক অন্ধকারে কাজ করে, শ্রম-ধান্দা-ফিকিরের শেষে শরীর যখন অবসন্ন, বুকে পরাজয়, চোখে-মুখে জীবনযাপনের ক্লেদ, মানুষ সে-সময় ধর্ম খুব ভালো খায়, পাঁকাল মাছও ছুটে আসে ধর্মের মদির চারে। এখানে ইঁদুররাই শুধু ভোর দ্যাখে। অসংখ্য ইঁদুর, বেড়ালের অধিক গতর তাদের, ভয়হীন ভ্রান্তিহীন চলনে রাস্তাপাট জুড়ে থাকা তন্দুরির টুকরো, মাংসের হাড়, ন্যাতানো বেগুনি, আলুর পিণ্ড, পাঁউরুটির মোড়ক, বোতলের ছিপি, পানমশালার পাউচ, ডেইলি লটারির কাগজ, নায়িকার শরীর, নষ্ট টেপের ফিতে অন্তহীন গর্তে টেনে নিয়ে যায়। গায়ে-মাখা সূর্যের তাপ বারবার গর্তে রেখে আসে উষ্ণ বসবাসের আশায়। আজ আরও দুজন ভোর হতে দেখেছে। ছেদিলালের তক্তপোশের ওপর চিৎ শুয়ে গান গাইছিল গুলে: ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে। দেশপ্রেমাত্মক অনুষ্ঠান বা দেশপ্রেমের প্রহসনে এইসব গান যে কুশলী অর্থময়তায় গায়, গুলের গলায় তা ছিল না, কারণ সুরের অভাব, শিক্ষার অভাব। তবে একটা মগ্নতা ছিল, যা এতদঞ্চলের পূর্ণ গভীর রাত ও তক্তপোশের নীচে জেগে-থাকা বেজির চোখে ভোরের আলোয় মাত্র দুটি লাইনে হাত-লাট্টুর মতো পাক খায়। গতকাল, দেশ-নাকি-ভেঙে-যাচ্ছে এরকম একটা হুঁশিয়ারিমূলক ও মেরামতিমূলক সভায় গানটা শুনেছে গুলে। ফাঁড়ির ভবা সিপাই কাল চুষিয়ে বেজিকে টাকা দেয়নি। উল্টে ধমকি দিয়েছে, মার্ডার কেসে ফাঁসাবে। চোষা বা চোষানোটা ক্রাইম নয়, আইনের হাতে পড়ে না, এই কাজে বেজি মাঝে-মধ্যেই ঠকে, বিশেষ করে কাজটা যদি পুলিশের হয়। ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছে, কিন্তু কী করবে, ভালো কাজ কই? ভারত কী গো, গুলেদা? আমাদের দেশ। তালে ইন্ডিয়া? একই হল। মিস ইন্ডিয়া? ওটা ভালো না। টনির বউ যেমন। মাই দেখায়, উরুত দেখায়। ইন্ডিয়া ভালো? ওরা তো বলে। মায়ের মতো। এত ভালো? ভালো, তবে... তক্তপোশের নীচে বেজি গুলের থেমে যাওয়া কথার ভেতর সন্দেহ টের পায়। তবে কী, গুলেদা? বেজি, তোর মাকে দেখতে ইচ্ছে করে? বেজির মা হয়ত এখন পালবাবুর গুদাম ঝাড় দিয়ে ফিরছে। গুদামে ইঁদুরের গর্ত থেকে চাল টেনে বের করতে হয়। মা একবার আংটি পেয়েছিল গর্তে। বাবা বিশ্বাস করেনি। মা-র ডান হাতের তিনটে আঙুল ইঁদুরের পেটে গেছে। বাবা বিশ্বাস করেনি। বাবা বলে, সব পালবাবুর খেল! লুকোও কেনে? আংটি দেয়, শরীল খায়। বেজির মা কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো দু-আঙুলওলা হাত নেড়ে বলে, বাজে কথা কোয়ো না। জিভ খসি যাবে। শঅরে চুল্লু ছাপ্লাই করিনি বলে যার-তার নামে বাজে কথা, ভগমান সবেনি। বেজির বাবার একটাই কথা, গাঁয়ের চার-পাঁচটা বউ কেরিয়ারি করে সুখে আছে। হাতে পয়সা এলে ভদ্দরলোকের মতো বাঁচা যায়। পয়সা এলে সরমান হয়। শহর তক্ গাড্ দে নে যাবে। কোনো ঝামেলি নেই। ফিরতেই হাতে হাতে পয়সা। বেজির বাবার দুঃখ, কত লোক তার বুদ্ধি নেয়, আর ঘরের মেয়েমানুষটা স্বামীকে গেরাহ্যি করে না। গুলে নরম গলায় জিজ্ঞেস করে, মা-র কাছে যাবি, বেজি? ভয় করে। সত্যিই ভয় করে বেজির। শিয়ালদা থেকে দু-ঘন্টা রেল। তারপর দুটো নদী। পথে যেখানে পাবে, খপ্ করে ধরবে পুলিশ। রিয়াজুলের বাপ বঁটি নিয়ে তেড়ে আসবে। আর, রিয়াজুলের লাশটা, পাথরে থেঁতলে দেওয়া মুখটা এখনও ঘুমের মধ্যে বেজিকে তাড়া করে। গুলে গান ধরেছে: বলো বলো বলো সবে, শত বীণা বেণুরবে। মায়ের কথায় বেজি বাবাকে পাবেই। এত অবিচ্ছেদ দুজনের। কত লোক দিনভর ঘুসুর-ফুসুর করে পাড়াপড়শির সর্বনাশ ভাঁজে। তার চেয়ে ঢের ভালো বেজির বাবা। কোনো সাতসকালে গলা অব্দি চড়িয়ে এসে হাঁক পাড়বে, তোদের বাড়ির জামাই এলাম রে, আদর-যত্ন কর, দাওয়ায় মাদুর বিছিয়ে তাকিয়া দে। ও বেজির মা, বরের সঙ্গে দু-হাত দাবায় বোসো না! বা, কোনো সন্ধেয় বর্ডার থেকে ফিরছে বলে উঠোনে দাঁড়িয়ে স্টেনগান-মেশিনগানের ট্যা-ট্যা-ট্যা-ট্যা শব্দে, যা সে দেশপ্রেমিক সিনেমায় দেখেছে, নিজেরই গলায় শত্রুর আর্তনাদের মধ্যে চিৎকার করে ওঠে, আউর চার দুশমন খতম হো গয়া। বা, সাইকেল ভ্যানে দাঁড়িয়ে সীতা-চোর রাবণের অট্টহাসি ও বক্তৃতায় চারপাশে লোক জমিয়ে দেয় বেজির বাবা। কোনোদিন যাবি না? জানি না। তুইও আমার মতো। গুলে কীরকম বেজি জানে না। বেজি এ তল্লাটে প্রথম যখন হাজির হল, পালাতে পালাতে; রিয়াজুলের থেঁতলানো মুখ থেকে, রিয়াজুলের বাপের বঁটির কোপ থেকে, মা-র কান্না থেকে, থানার ভয় থেকে আর সেই সাধুবাবার খপ্পর থেকে, গুলেকে সে বলে ফেলেছিল তার পাপের কথা, মনে হয়েছিল, গুলে তাকে বাঁচাতে পারে। বছরখানেকেই বেজি পাল্টে গেছে। বোঝে, মা-বাবা একটা লতলতে ব্যাপার। ভেন্ডি সেদ্ধর মতো, মাখামাখি করে হড়কে যায়। বেশি চটকালে গা ঘিনঘিন করে। তার মা খালপাড়ে থাকে, এর একটি বেশি কথা গুলে এতদিনেও বলেনি। গুলে গানে ফিরেছে: ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে। মানেটা বেজির বুদ্ধিতে খুব পরিষ্কার নয়। তবে গানটা ভালো, বেজি ধরতে পারে। লালপাড় হলুদ শাড়ি-পরা, গাঁয়ের মাঠে জোছনার মতো মেয়েরা এবং বকের মতো সাদা জামা-পরা ছেলেরা গলা মিলিয়ে গাইছিল, তারা নিশ্চয় লেখাপড়া জানে, তাদের বড়ো ঘরবাড়ি আছে। বিল্লে একবার ‘চুরালিয়া’ বলে চেঁচিয়ে উঠল। ওরা কানে তোলেনি। কাল গুলের কাজ হয়নি। কেষ্টপুর থানার মেজবাবু নিমাই সাঁতরার খুলির পেছন দিকটা কারা যেন কুপিয়ে নামিয়ে দিয়েছে। তার জন্যে চুল্ল-গাঁজা-হেরোইন পাচার, জুয়া-সাট্টা, প্রোমোটারের হিস্সা, রেশনের মালঝাড়ি, হোটেলের হপ্তা, ভাড়াবাড়ির দালালি, ভাড়া-গাড়ির কমিশন সব বন্ধ। থানার ধারে-কাছে ঘেঁষতে পারেনি গুলে। গা-চকচকে সব ঘ্যামা গাড়ি। রাতে লরি ধরার কাজও হবে না। বিকেলেই খবর পায়। এ পাড়ায় দু-বেলা শোক এই প্রথম। আমদানিহীন সেই সন্ধেয় বড়ো রাস্তার মোড়ে রঙিন কাপড় বাঁধা মাচার পাশেই বসে পড়ে গুলে। দানু সিংয়ের ঝক্কড় গাড়িটা যেখানে মামলার কু্ষ্ঠে তিন বছর পড়ে থেকে থেকে হাত-পা-মাথা-ইঞ্জিন সর্বাঙ্গ খসাচ্ছিল, সেটা সরিয়ে যে গলতা বেরিয়েছে, তা নিয়ে কাস্তে-হাতুড়ি আর বাঘ ঝান্ডার ঘোর লড়াই, সেখানে ‘দেশ ভাঙার চক্রান্ত রুখছি রুখব’ হল। খারাপ পাড়ার সন্ধের মতো একটা ভীতু লোভী ও মাগনার ভিড় প্রথমে লাট খাচ্ছিল, বিশেষত বক্তৃতা যখন চলে, পরে রাত্রি হলে জমে যায় গানে এবং বিশেষত সুন্দর সুন্দর বন্রুটির মতো নরম বুকের মেয়েমানুষে। নিজের মুখে বসন্তের দাগের চেয়েও গুলে বেশি ভালো চেনে এই ভিড়। বেজিকে খুঁজেছিল। ছেলেটা জলসা ভালোবাসে। হয়তো কাজে গেছে কাঁটাপুকুর বা মালিপাড়া। দুটো বুড়ো খদ্দের আছে, কাজ না হলেও দু-পাঁচ টাকা দিয়ে দেয়। পুলিশ লাইনে আজ কড়াক্কড়ি। কাঁটাপুকুর বা মালিপাড়া গেলে বেজির ফিরতে দেরি হয়। বড়োরাস্তায় তখন বাড়ি-গাড়ি সব গুটিয়ে যায়। জমে-ওঠা গানবাজনার মধ্যেই বেজি ফেরে। গুলের পাশে বসে। কোত্থেকে এলি? বেজি জবাব দেয় না। কোথায় গেসলি? বেজি জবাব দেয় না। কী হল? ওই শালার ভবা সিপাইটা ধরল। কিছু বলল? শ্মশানে নিয়ে গেল। শ্মশানে কেন? ছেত্রীদের ভাঙা বাড়িতে। ওখানে কে থাকে? কেউ না। কাজ হবে বলে নিয়ে গেল। থানা আজ ভারি গরম। যখন-তখন তোলতাই হতে পারে। ভড়কি দিয়ে কাজ করিয়ে নিল। পুরো মাল খালাস করলাম। শালা, টাকা চাইতেই বলে, একবার তুললে মার্ডার কেস। মাচায় গান হচ্ছে: ধর্মে মহান হবে, কর্মে মহান হবে। গুলে বেজিকে ভরসা দেওয়ার মতো কথা খুঁজে পায় না। শুধু ওর গায়ে হাত রাখে। গান চলতে থাকে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুধের সর পড়ার মতো ভিড় আরও আঁট হয়। প্রতিটি গানের শেষে এক খামচা ভিড় হাততালি দেয়। প্রতিটি গানের শেষে একটা লোক খানিক বক্তৃতা করে। প্রতিটি গানের শেষে ছেলেরা-মেয়েরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে, হাসি দেওয়া-নেওয়া করে। গুলে বেজিকে বলে, তুই এখান থেকে পালা। ব্যাপারটা অনেকবার ভেবেছে গুলে। বেজি এভাবে বাঁচতে পারে না। বেজিকে বাঁচানো যাবে না। যে ছেলেটা খুনের ঘটনার জন্য কষ্ট পায়, যে ছেলেটা খুনি হয়ে উঠতে পারবে না, বরং ভালোভাবে বাঁচতে চায়, পুলিশ তার রক্ত চুষে আধমরা করে বাঁচিয়ে রাখবে। বেজি যতই বলুক, রিয়াজুল হঠাৎই মরে গেল, যতই বলুক, তারা তিনজন গরমের দুপুরে পুকুরে খেলছিল, গুলেদা, অত বড়ো পুকুর তুমি দ্যাখোনি, ওলাবিবির পুকুর, ঠান্ডা জল, নিমগাছ জামগাছ ঝুলে আছে, একটা টগর আর একটা কাঁঠালিচাপা, কত ফুল জলে ভাসে, ওলাবিবির থানের দিকে জলটা কেমন সবুজ, ওষুধের গাছ সব ফুটে আছে, জানো গুলেদা, বলাই এক দমে পুকুর পার করে দেয়, তলা থেকে মাটি তুলে আনে, বলাই বলেছে, পুকুরের নীচে তিনটে কুয়ো আছে, তাই চোত-বোশেখেও জল শুকায় না, ওলাবিবির থানের নীচে লুকোনো সিঁড়ি কুয়ো থেকে উঠে এসেছে, পুকুরে যেসব ফড়িং উড়ে বেড়ায় তারা ওলাবিবির ঘোড়া হরিণ, জোছনার রাতে মাঠে তাদের দেখা যায়। বিশ্বাস করো গুলেদা, বলাই আর আমি জামগাছ থেকে ঝাঁপাচ্ছিলাম, রিয়াজুল একটা হেলে ধরে ছুঁড়ে দিল আমাদের দিকে, বলাইয়ের মুখে লেগেছিল সাপটা, রিয়াজুল খুব হাসল, তেড়ে গিয়ে বলাই রিয়ালের এক ঘুসিতে ছিটকে পড়ে, মায়া হলের সিনেমার মতো রিয়াজুল ঘাড় বেঁকিয়ে ঘুসি পাকিয়ে এক পা এক পা এগিয়ে আসে আমার দিকে, আমি চিন্টুদার মতো লাফিয়ে ক্যারাটে ঝাড়লাম, রিয়াজুল ঘাটে মাথা ঠুকে ডিগবাজি খেয়ে জলে পড়ল, বলাই আর আমি টেনে তুললাম, মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত পড়ছিল, শরীরে সাড় নেই, নেতিয়ে পড়ে আছে। বলাই ওর মুখে ফুঁ দিয়ে, বুকে-পিঠে চাপ দিয়ে সাড় আনার চেষ্টা করল। তারপর বলল, বেজি, রিয়াজুল মরে গেছে। বিশ্বাস করো গুলেদা, আমি লোকজন ডাকতে বললাম। বলাই ভয় দেখাল। বলল যে আমার ফাঁসি হবে। আমি রিয়াজুলকে মেরে ফেলেছি। তারপর একটা ঝোপে বডি টেনে নিয়ে রিয়াজুলের মুখ ইট মেরে থেঁতলে দিলাম। বলাই বলল, লোকে বুঝবে অ্যাকসিডেন্টে মরেছে। আমরা বেঁচে যাব। দু-দিন রিয়াজুলের আতিপাঁতি খোঁজ চলল গ্রামে, পাশাপাশি গ্রামে। বেজি কিছু বলেনি। বলে দিল বলাই। বন্ধু বলাই পাত্র সাক্ষ্য দিয়াছে যে পুকুরে কলহ করিতে করিতে বেজি রিয়াজুলকে ধাক্কা মারে। রিয়াজুল ঘাটে মাথা ঠুকিয়া পতিত হয়। বলাই রিয়াজুলকে বাঁচাইতে চেষ্টা করে। কিন্তু, বেজি তাহাকে ভয় দেখাইয়া রিয়াজুলকে টানিতে টানিতে ঝোপে লইয়া যায়। তত্রস্থ পাথর দিয়া উপর্যুপরি ঘা মারিতে মারিতে মৃতের মুখশ্রী ভয়ঙ্কর নষ্ট করে ও তাহাকে হত্যা করে। সাক্ষীর বয়ানে জানা গেছে, আসামী বেজির ভয়ে সে দুইদিন ঘটনা কাহাকেও বলে নাই। অবশেষে মনস্তাপজনিত কারণে সাক্ষী তাহার পিতা ও মাতার কাছে খুলিয়া ব্যক্ত করে। সাক্ষীর পিতা সুধাকর পাত্র ও মাতা শিউলি পাত্রর বয়ানে প্রকাশ যে তাহারা তাহাদিগের পুত্রকে আসামী বেজি ওরফে বিজয় লোধের সঙ্গে মিশ্রিত হইতে পুনঃপুনঃ নিষেধ করিয়াছে। তাহাদিগের পুত্রকেও আসামী খুনের চেষ্টা করিয়াছিল। মৃত (নিহত) রিয়াজুল ইসলাম, বয়স আন্দাজ ১৪ পিতা হাজি রফিকুল ইসলাম, বয়স আন্দাজ ৫৮ আসামী বিজয় লোধ ওরফে বেজি, বয়স ১৩ পিতা গগন লোধ ওরফে বোতল, বয়স আন্দাজ ৩৩ সাক্ষী বলাই পাত্র, বয়স ১৩ পিতা সুধাকর পাত্র, বয়স ৪১ তদন্তকারী অফিসার মেলেটি থানার সেকেন্ড অফিসার শ্রী শক্তি ঢ্যাং। তক্তপোশের ওপর নীরবতা। তক্তপোশের নীচে বেজি বিড়ি ধরায়। গুলে হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। এসময় একটা ঘুম শরীর অবশ করে দেয়, কিছুতেই ঠেকানো যায় না। মাথার ভেতর ফোঁটায় ফোঁটায় ঘুমের মধু ভারী হতে থাকে। বেজিরও ঘুম পাচ্ছে। সে দেখে, ইঁদুরগুলো নিজেদের এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় ঢুকে পড়েছে। ঝগড়া করছে। তাড়া করছে। পালাচ্ছে। তারই মধ্যে দাঁতে খুটছে গোটানো কাগজ, সিগারেটের খোল, প্লাস্টিকের কাপ, শুকনো ফুল। লালজানের কুচো বাঁদরটা যে দড়িতে বাঁধা থাকে, সেই দড়ি বেয়ে ওঠার চেষ্টা করছে একটা ইঁদুর। লালজানের দোকানের বন্ধ পাল্লায় সাঁটা মেয়েমানুষটা ইঁদুরের খেলা দেখে হাসছে। গন্ধেশ্বরী ভান্ডারের সামনে ছড়ানো-ছিটানো ডাল-জিরে-ধনে কবেই সাফ হয়ে গেছে। রসুনের খোসা নিয়ে খেলছে একটা সরু ইঁদুর। লালার রেশন থেকে ক্যাশমেমোর বান্ডিল টেনে বের করেছে দুটো ইঁদুর। এখনও কুটিকুটি করছে। দত্তবাবুর ডাক্তারখানায় আরও একটা গর্ত করে ফেলেছে। লালবাড়ির নর্দমার ভাঙা নলের বাইরে ঝুলছে একটা লেজ। রফিকের সোনারুপোর দোকানের সামনে নালায় ইঁদুররা সাধারণত যায় না। পেচ্ছাপের গলির মাটি দাপিয়ে বেরিয়ে এল এক গাড়ি ইঁদুর। তাদের স্যাঁতসেঁতে গা রোদে র্যাফের উর্দির মতো লাগে। সেইসব খাম্বাজ ইঁদুরের কাছে বাকিদের নেংটি মনে হয়। ছেদিলালের তক্তপোশের নীচে অন্ধকারে শুয়ে বেজি দেখে, চ্যাটচেটে রোদ্দুরে ভারী ইঁদুররা কুচকাওয়াজ করছে। তাদের মাথায় টুপি, কোমরে বেল্ট, পায়ে শাসন। কোনো গোলমাল তারা বরদাস্ত করবে না। তাদের প্রথম কথা শান্তি, শেষ কথা শান্তি। তারা সবাই একরকম দেখতে, একরকম কথা বলে। মহিম মুদির দোকান থেকে লালুর সস্তা সাবান-সেন্টের গুমটি পর্যন্ত, তারপরই বড়োরাস্তা, ইঁদুরের দল কুচকাওয়াজ করে। দলছুট কোনো খাম্বাজ এক ফাঁকে শাঁখা-পরা একটা হাত পেচ্ছাপের গলিতে টেনে নিয়ে যায়। লালবাড়ির নর্দমার ভাঙা নল থেকে খসে পড়ে রক্তাক্ত ইঁদুর। কাঁকড়ার মতো দু-আঙুলওলা হাতটা ছেলের মাথায় মুখে পাগলের মতো বোলাতে বোলাতে বেজির মা কাঁদছিল আর বলছিল, তুই পালা। এখান থেকে পালা। সোনা আমার, ঠাকুর আমার। অনেক অনেক দূরে পালিয়ে যা। ওগো, তোমার দুটো পায়ে পড়ি, ছেলেটাকে নদী পার করে দাও। ও যে পথ চেনে না। কোন পথ ধরে রিয়াজুলের বাপের হাতে পড়বে! ঘাটের মাঝিগুলো ধরিয়ে দেবে! অনেক দূরে যা মানিক আমার, ধন আমার। মায়ের রক্ত থেকে দূরে যা। বলবি না তোর মা আছে, বাপ আছে, ঘর আছে। শেষরাতে স্টেশনে পৌঁছে বেজির বাবা বলে, যাও তবে পুত্র মোর যুদ্ধের তরে। সম্মুখে দ্যাখো ওই শক্রর পতাকা উড়িতেছে সমুদ্রবাতাসে। বীর পুত্র মম, সাহসে স্থির হও, অস্ত্রে দাও মন, তব সমরকৌশলে মুক্ত হোক মাতৃভূমি, নিজের শোণিত রক্তে আনো স্বাধীনতা। রত্নগর্ভা জননীর হে বীর সন্তান, পামর এ পিতার লহ আশীর্বাদ। ঘুরঘুট অন্ধকারে কপাল-চোখো ট্রেন এল। তার অন্ধকার শরীরে মিলিয়ে গেল বেজি। অন্ধকারে কি বাতাস থাকে না? শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। দম বন্ধ হয়ে আসে। নদীর জলে বাতাস থাকে না? ছইয়ের ভেতর বাতাস থাকে না? তারার আকাশে বাতাস থাকে না? তবু বাবা সঙ্গে ছিল। ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে পালাতে পালাতে বাবা বলে, ফাঁসি দিলে দম আটকে যায়। জিভটা বেরিয়ে ঝুলতে থাকে। গর্ত থেকে চোখ বেরিয়ে যায়। অ্যা-অ্যা-অ্যা-অ্যা। গলার ভেতরে কফের ঘর্ঘরে সেই আর্তনাদ বেজিকে কুঁকড়ে দেয়। অন্ধকারে একটা হাত বেজিকে টেনে নেয়। খোকা, কোথায় যাচ্ছ? বাড়ি কোথা? কী নাম? মা বকেছে? বাবা বকেছে? বাবা-মা নাই? আহা, এটুকু ছেলের মা-বাবা নাই। তুমি আমার কাছে থাকো। রাজা-রানির গল্প বলব, ভূতের গল্প বলব, চোর-ডাকাতের গল্প বলব। চিকেন রোল দোব, আঙ্কল চিপস্ দোব, কোকাকোলা দোব। এখন এটা খাও। খাও। আমি সাধুবাবা। আমাকে সবাই ডরায়। তোমার কোনো ভয় নাই। আমার কাছে থাকবে। তোমার জিভ আছে। খেলা করো। চুষে চুষে খেলা করো। লোকটা বেজির মাথা খাবলে ধরে টেনে নামিয়ে মুখে পুরে দিতে চাইছে নিজের পেচ্ছাপের নলটা। বমির ধাক্কায় বেজির পেট থেকে সব কিছু বেরিয়ে আসতে চায়। বেজি গোঙায়। তক্তপোশের ওপর থেকে গুলে জিজ্ঞেস করে, কী হল? ঘুমিয়ে পড়লি নাকি? বেজি জবাব দেয় না। সেই সাধুবাবাটা আবার এসেছে, যে তাকে ঘরে আটকে রাখে, ঠোঙায় ভাঁড়ে নানারকম খাবার নিয়ে আসে, চোর-ডাকাতের গল্প বলে নিজের সাহস ফাটায়, আর... বেজির তখন আর বমি হয় না। তবু সে পালায়। ভবাসিপাই তোকে নিমাইবাবুর কথা বলল? না। পোস্টার মেরেছে। আজ বটতলায় মিটিন। নিমাইবাবুর বউকে আনবে। নিজেরাই শালা ঝেড়ে দিল। এখন কালপিট খুঁজছে। দুটো দিন সামলে থাকিস। ওদিকে ডাকলে যাবি না। তোর বাড়ি কুসুমপুর? বিজয় লোধকে চিনিস? তোর মতো বয়স। তোর মতো দেখতে। বাপের নাম গগন। সাধুবাবা হয়তো জানতে পেরেছিল। ছেলেটা যে ভয়ে সিঁটিয়ে যায় হয়তো টের পেত। সাধুবাবা বলত, তোর কোনো ভয় নাই। আমার কাছে থাক। আমি থাকতে তোর গায়ে হাত দেয় কে? বেজিকে কটা দিন কোথাও পাঠানোর কথা ভাবছিল গুলে। কিন্তু কোথায় পাঠাবে? তাছাড়া, বেজি হাওয়া হলে পুলিশ গুলেকে তুলতে পারে। গুলে জানে না, পুলিশ কাকে টার্গেট করেছে। সেরকম হলে বেজিকে ফাঁসিয়ে দেবে গুলে। বেজির খুনের রেকর্ড আছে। আর কিচ্ছু লাগবে না। নিমাইবাবুর মার্ডার কেসের খুনি ৪৮ ঘন্টায় গ্রেপ্তার। রিয়াজুলের কেস সঙ্গে লাগিয়ে এক টিলে দু-পাখি মারার পুলিশি বাতেলা চলবে কিছুদিন। বেজি, তুই কোথায় যাবি? গুলের মাথাটা মাঝে-মধ্যে ম্যানহোলের মতো জ্যাম খেয়ে যায়। ওপরে শুবি? আয়। গুলের ডাক বেজির বুকের ভেতর ঠাকুর-দেবতার গলার মতো সাউন্ড করতে থাকে। ডাকলে, গুলেদা? ওপরে আয়। বেজি তো রোজ ওপরে গুলের পাশটিতে এট্টুকুন জায়গায় শুতে চায়। তক্তপোশের নীচে ভয়ের গন্ধ। ছেদিলালের উনুনের পোড়া কয়লার ডাঁই, ময়লা ন্যাতাকানি, নর্দমার জলে ভেজা ঠান্ডা মাটিতে, বেজির মনে হয়, ইঁদুরের গর্তে শুয়ে আছে। মা-র তিনটে আঙুল খেয়েছিল। বেজিকে কোনদিন পুরোটা খেয়ে ফেলবে। তোমার ঘেন্না করবে না? না। বেজি যে কাজটা করে তা ঘেন্নারই কাজ। ঘেন্নায় বেজি নিজে অনেক রাতে গলা দিয়ে খাবার নামাতে পারে না। গুলে একপাশে সরে জায়গা করে দেয়। বেজি প্যান্ট গেঞ্জি ভালো করে ঝেড়ে নেয়। ভবা তোকে নিমাইবাবুর মার্ডারের কথা বলল? বলেনি তো! তুই যে বললি, ভয় দেখাল। ৩০২ করে দেবে বলেছে। শালা এক নম্বর হারামি। চেপে যা। পুলিশ এখন যা বলবে, তাই করবি। গুলেদা! বল - গুলে পাশ ফিরে বেজির গায়ে হাত রাখে। তুমি কত ভালো। নিমাইবাবু একবার তোকে লালী সিংয়ের ঘর থেকে তুলল মনে আছে? খুব মারল নোংরা কাজ করি বলে। তা আমি বললাম, ভালো কাজ দাও। তোকে দৌলত মিস্ত্রির প্যাকিনের কাজে লাগাল। খাটনির চোটে পালিয়ে এলি। খাটনি না, গুলেদা। দৌলত মিস্ত্রি পেরেক লাগানো চেলা কাঠ দিয়ে মারে। দৌলত বলেছে, এসব মিছে কথা। যে ছেলে চুষে রোজগার শিখেছে, সে খেটে খাবে কেন? নিমাইবাবু তোর কথা বিশ্বাস করেনি। সন্দ করত। এখানে সেখানে খোঁজখবর নিত। তালে নিমাইবাবু খুন হল ভালোই হল, কী বলো গুলেদা? সাতাশ নম্বর বাড়ির মাথা ডিঙিয়ে ছেদিলালের চালায় রোদ পড়েছে। এরপর আস্তে আস্তে নেমে আসবে তক্তপোশে। বড়োরাস্তায় গাড়ির শব্দে মানুষের গন্ধ লেগেছে। নিশিডাকের মতো হাওয়ায় হারিয়ে যায় না। গঙ্গা থেকে যে বাতাস ঠান্ডা নিয়ে আসছিল, সেটা তেতে উঠছে। মরা ইঁদুরটার জন্যে দু-দশটা কাক আজ বেশি এসেছিল পাড়ায়। অন্যদিন অভ্যাসবশত যারা ডেকে উড়ে যায়, ইঁদুরদের জন্য যারা এ পাড়ায় পাত পায় না, আজ তারা প্রতিশোধ খুঁজে পেয়ে আরও কয়েকজনকে ডেকে এনেছিল। গুলেদা, গানটা আর-একবার ধরো না। ভারত আবার... সেই ফাংশানটার কথা মনে আছে তোর? ‘সরসতী’ পুজোর পর বড়োরাস্তায় হোলনাইট হল। থাকবে না! মিস লায়লা নাইট। একটা মেয়েই জমিয়ে দিল। পিঠটা পুরো খালি। গলা আর মাজায় ফটকামতন গেরো। গাণ্ডুরিয়াদের ছেলেটা টাকা দিল। দিল কী গো, নিজে হাতে মেয়েটার বুকে সেপ্টিপিন দিয়ে একশো টাকার নোটগুলো ইচ্ছেমতন আটকে দিচ্ছিল। গাণ্ডুরিয়াদের অনেক টাকা। চোলি কে পিছে কা হ্যায়। সায়া তুলে ন্যাংটো দেখানো কি নোংরা নয়? তুই দেখলি, তিনটে শুয়োর স্টেজে উঠল। তিনটে নয়, পাঁচটা। ওরা ড্যান্স করল। শুধু ড্যান্স! হিঁকি হিঁকি আওয়াজ! ফাংশান জমে রাবড়ি। ধাঙড়পট্টির লোকজন ডান্ডা নিয়ে ছুটে এল। শুয়োর চোট গেলে হেভি লস। চারটা ধাড়ি, একটা বাচ্চা। বাচ্চা শুয়োরটা একবার হেলেন, একবার প্রভুদেবা। হাঙ্গামা হল। ওরাও ডান্ডা ড্যান্স লাগাল। মাল খেয়ে চুর। শরীর হড়কে হড়কে যায়। তবু কী নাচ শালাদের যেন মরণ লেগেছে! গুলে বেজির মাথায় হাত বোলায়। তোর কথা কেউ বিশ্বাস করে না। না করুক। তুমি তো করো। তুই রিয়াজুলকে খুন করিসনি। সাধুবাবা তোকে নোংরা কাজ শিখিয়েছে। কাঁটাপুকুর মালিপাড়ার লোকগুলো তোকে টেনে নিয়ে যায়। দৌলত তোকে পেরেক লাগানো কাঠ দিয়ে মারে। ভবা সিপাই ছেত্রীদের ভাঙা বাড়িতে নিয়ে যায়। তোর দোষ নেই। এ কথা কেউ বিশ্বাস করে না। তুমি করো না গুলেদা? গুলের জানাতে অসুবিধা হয় না যে তার করা না-করায় কিছু যায় আসে না। বেজিকে পাশ ফিরিয়ে দেয়। ঘুমোতে বলে। গুলে গান ধরে। বেজি দেখে, ভবা সিপাই তাকে ডাকছে। পকেট থেকে বড়ো পাত্তি বের করে দোলাচ্ছে। মনোহরের দোকানে আঙুরের রস খাচ্ছে ভবা। রস পেষাইয়ের মেশিনের গায়ে মোটা মতন ধূপ জ্বালায় মনোহর। বোঁটকা গন্ধ ছাড়ে। ভবার পকেটে সবসময় মুঠো মুঠো খুচরো থাকে। হাঁটলে শব্দ হয়। হাসলে শব্দ হয়। বসলে শব্দ হয়। পাশ ফিরলে শব্দ হয়। ভবা বলল, তুই শালা মুসলমানের ঘর করেছিস। তোর জাত গেছে, ধম্মো গেছে। তবু আমি তোকে ঘরে তুলেছি। তোকে ভালোবাসি বলেই তো। বেজির চুলের ভেতর ভবার আঙুল খেলা করে। ভবার ভুঁড়ির এক বেঘৎ নীচে নেমে গেছে বেল্ট। চাকতি লাগানো টুপি আটকে আছে কাঁধের আংটায়। গেঞ্জিটা খুলে ফেল। কাঁচা পাইখানার গন্ধ ছাড়ছে। কাল দুটো সিঙ্গাপুরের মাল দেব। জায়গাটা ভালো না। পাঁচিলের ধারে চল। শ্মশানে কতরকম বডি আসে। বেজিকে চুমু খায় ভবা। ঠোঁট আলতো কামড়ে দেয়। শিরদাঁড়ার দু-পাশ দু-হাত দিয়ে ঘষতে থাকে। বেজির ভয় করে। ভবা সিপাই শক্ত হচ্ছে। ওর হাত-পায়ে জোর বাড়ছে। ছেত্রীদের ভাঙা বাড়ির মেঝেয় সাপের বাসা। দেওয়ালে হাঁটে চন্দ্রবোড়া। বেজি পালাতে চায়। ভবা বেজির বুকে চুমু খেতে খেতে লালা মাখিয়ে দেয়। ভবার ঠোঁট বেজির শরীরে হাঁটে। বেজির প্যান্ট খুলে দু-হাতে পাছা টিপে ধরে। একটা হাত লিঙ্গ নেড়ে বেজির মাথায় উঠে আসে। মার্ডার কেসে ফাঁসলে জীবন বরবাদ, বলে ভবা আঙুলের চাপে বেল্ট খুলে দিলে ঝমঝমিয়ে প্যান্ট নেমে যায়। ঘাড় ধরে বেজির মুখ নামিয়ে ভাঙা পাঁচিলে বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, নে, তাড়াতাড়ি কর। বেজি দ্যাখে, চন্দ্রবোড়া ফণা তুলেছে। ভবার হাত সাঁড়াশির মতো বেজির ঘাড় আটকে রেখেছে। নিজের শরীর বেঁকিয়ে ভবা সাপ ও বেজির দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে প্রাণপণ চেষ্টা করে। তোর কোনো ভয় নেই। তুই আমার ঘর করিস। কোনো হারামির কাছে তুমি যাবে না। বেজি খপ্ করে সাপটাকে মুখে পুরে নেয়। যত জোরে পারে কামড়ে ধরে। সে সাপটাকে গর্ত থেকে বের করতে হ্যাঁচকা টান মারতে থাকে। সাপের হাত-পা লাফায়। ছাড়, বেজি। চিৎকার করে গুলে বেজির মাথা তক্তপোশে ঠুকে দেয়। বেজির দাঁত থেকে খসে যায় গুলের শরীর।

1111-removebg-preview.png

গল্পের বই উপহার পেতে কে না চায়!
এখনই Subscribe  করুন,
আর পেয়ে যান আপনার প্রথম বইটির মূদ্রিত মূল্যের ওপর ২৫% ছাড় 

Thanks for being our family!

  • Youtube
  • pngwing.com
  • 1111
  • tumblr
  • Instagram LOGO PNG2

+91 8240333741

Magic Seeds Books LLP

119 Abhay Patuli Lane, Shuksanatantala, Chandannagar 712136

Email us at: manikarnika.pub@gmail.com

For any other queries feel free to reach us at: 8240333741(Call/Whatsapp)

©2022 by Manikarnika Prakashani.

bottom of page