Search Results
91 results found with an empty search
- Testimonials | Manikarnika Prakashani
Testimonials of our customers and colleagues আপনার অভিমত জানান
- চিঠি দিয়ো লাল তারা । শাশ্বত ব্যানার্জী | Manikarnika.Pub
চিঠি দিয়ো লাল তারা। শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় Our Store Amazon দুচোখে সমুদ্র চষার স্বপ্ন নিয়ে চুপিচুপি বাড়ি ছেড়ে চলে যায় বিজন। বহুবছর পর এক বিশেষ কারণে ফিরে এসে দ্যাখে তার দাদার ছেলে রুকু বড়ো সুন্দর হয়েছে। বিজনকে বড্ড ভালোবেসে ফেলে রুকু। আর অমনি আশ্চর্য কত কিছু ঘটতে থাকে ওদের জীবনে। কোন জাদুবলে সমুদ্রের মতোই অপার হয়ে যায় রোজকার বেঁচে থাকবার আনন্দ। কিন্তু এত আনন্দ এত ভালোবাসা তো সহ্য করে না সংসার। ক্রমাগত ভাঙনেই তার আনন্দ। পরিবারে জন্ম নেয় তীব্র টানাপোড়েন। বিজু কি তাহলে চলে যাবে? আর রুকু, সে-ই বা কেমন করে থাকবে তার কাকুমণিকে ছাড়া? বড়ো হওয়ার পথে কোত্থেকে শক্তি পাবে সে? মূল্য : ₹ ২৫০ শিপিং : ₹ 0 প্রচ্ছদ : শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় মণিকর্ণিকা প্রকাশনী Call & WhatsApp : 8240333741 Our Store Amazon ❛ মাওফ্লাং অরণ্যের গান _________________________ শিলং থেকে পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার দূরে রয়েছে মাওফ্লাং অরণ্য। সে এক পবিত্র বন। ওখানকার খাসি উপজাতির লোকজনেরা বুক দিয়ে আগলে রাখে এই অরণ্যের প্রত্যেক প্রাণী, প্রত্যেক গাছকে। এই গায়ক কল্পনা করেছে ওই পবিত্র অরণ্যের গাছগুলো যদি শব্দ করে গাইতে পারত তাহলে এই গানটা গাইতঃ যে গান আমি ভালোবাসি যে গান আমি ভালোবাসি যে গান আমাকে গভীরভাবে ভাবায় যে আমাকে ডাকে, আমাকে দেখিয়ে নিয়ে চলে পথ কাল যেমন প্রাচীন সে ঠিক ততখানিই বুড়ো চারটে ঋতুর পরেও সে বেঁচে থাকে পৃথিবীর গভীর থেকে ফুটে ওঠে সে দোতারার বুক থেকে উঠে সে বয়ে যায় প্রকৃতির ভেতর তার প্রতিধ্বনি পাবে দ্যাখো, কেমনভাবে উঠছে সে দোতারা থেকে সে মিশে যাচ্ছে শিরায় শিরায় সে চলে যাচ্ছে আত্মার গহনে নিঃসাড়ে, বড়ো নিঃসাড়ে সে মেলে ধরবে ডানা আর শান্ত হয়ে বসবে জলের ওপর, ডাঙার ওপর, বাতাসের পরে। মাত্র চারখানা মিহিন রেশমতন্তু থেকে জেগে ওঠা সুর আমার মাথার ভেতর খেলা করে। বেজে ওঠে বুকের মধ্যে সে আমায় ভেতর জাগিয়ে তোলে আশা। ঠিক যেন জলের প্রবাহ এক অনন্ত ঘূর্ণন। নিশিদিন সে বয়ে যায় আপন খেয়ালে। যে গান আমি ভালোবাসি যে গান আমি ভালোবাসি ছেঁড়া ছেঁড়া বাক্যে গানটা বাংলায় দাদাকে বলে দিল বিজু। একটা বাংলা কবিতার মতো করে। সুজনের ভেতর কবিত্ব জিনিসটা নেই। ওর পছন্দ বেশ যুক্তিগ্রাহ্য কাঠখোট্টা বিজ্ঞান। তবু আজ এই গানটা যেন খানিক স্পর্শ করল সুজনকে। একটা সুর কেমনভাবে ডানা মেলে জলে স্থলে বাতাসে শান্ত হয়ে বসে সেটা ও দেখতে পেল এই মাঠের ওপর। বিজুর শোনানো গানটাকে দেখা যাচ্ছে - সে কাছে, আবার সে দূরেও, এইভাবে একাকার হয়ে আছে। ❜
- চলো যাই লঞ্জেসের দেশে । সুদেষ্ণা মৈত্র | Manikarnika.Pub
চলো যাই লঞ্জেসের দেশে । সুদেষ্ণা মৈত্র বিষয় : ছোটোদের গল্প প্রচ্ছদ : ঈশ্বর কর্মকার মণিকর্ণিকা প্রকাশনী মূল্য : ₹১৮০ যোগাযোগ (কল ও হোয়াটস্অ্যাপ) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির একটি গল্প এখানে দেওয়া হল। স্কুলে এল নতুন বন্ধু পশু ইস্কুল। গরিলা হেডস্যার। স্কুলে বিড়াল, কাঠবিড়ালি, টিকটিকি, ইঁদুর, অনেকেই পড়ে। আজ এ্যাসিমলিতে হেড স্যার এসে বললেন, ‘স্টুডেন্স, আজ তোমাদের ক্লাসে এক নতুন বন্ধু আসবে, সবাই মিলেমিশে থাকবে। নতুন বন্ধু নিজেদের জিনিসপত্র, টিফিনের ভাগ দেবে কিন্তু! শুনেছি বিড়াল ভায়া নতুন বন্ধু এলে একটু দুষ্টুমি করে থাকো, এবার কিছু যেন না শুনি। নিজেদের ক্লাসে চলে যাও।’ ক্লাসে ঢুকেই বিড়াল জানলার কাছে চলে গেল। দেখল গায়ে খোঁচা খোঁচা কেমন যেন দেখতে একজন টিয়া ম্যামের হাত ধরে আসছে। সে চেঁচিয়ে বলল, ‘নিউ ফ্রেন্ড আসছে রে। গায়ে খোঁচাখোঁচা জামা। আমার পাশে বসবে না কিন্তু।’ কাঠবিড়ালি বলল, ‘আবার শুরু করলি! তোর উৎপাতে ইঁদুর ভায়ারা কতদিন স্কুলে আসেনি। সেই জন্য তুই বকাও কম খাসনি।’ বিড়াল মুচকি হাসল। এর মধ্যে টিয়া ম্যামের হাত ধরে প্রবেশ করল সজারু সিং। টিয়া ম্যাম বলল, ‘গুড মর্নিং স্টুডেন্স।’ সবাই বলল, ‘ গুড মর্নিং মিস।’ টিয়া ম্যাম বলেন, ‘তোমরা তো শুনেছ, তোমাদের নতুন বন্ধুর কথা। এ হল সজারু সিং। আমি আসছি একটা খাতা নিয়ে। তোমরা সকলে ভাব করে নাও।’ ক্লাসের সবাই ওকে ঘিরে ধরল। নিজের নিজের নাম বলল। বিড়াল লেজ ফুলিয়ে মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে ‘আমি বিড়াল ভায়া’ বলেই সজারুর গায়ে হাত রাখতে গিয়ে ‘উফ’ করে উঠল। তারপরই রেগে গেল। চিৎকার করে বলল, ‘এমা প্রথমদিনই আমায় ব্যথা দিলে।’ সজারু কাঁদতে লাগল। টিয়া ম্যাম এসে সব শুনেই খুব বকলেন সবাইকে। তারপর সজারুর হাত ধরে ক্লাস থেকে চলে এলেন। কাঠবিড়ালি ছুটল পিছন পিছন। টিয়া ম্যামকে ডেকে সব খুলে বলল। টিয়া ম্যাম বললেন, ‘ছুটির পরে এসো তো একবার।’ ছুটির ঘণ্টা বাজতেই মা-সজারুর কাছে সজারু সিং ছুটে গিয়ে কাঁদতে থাকল। বারবার বলল, ‘কাল আর স্কুলে আসবে না।’ মা সজারু কিছু না বলে ওকে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন। স্কুলের পর টিয়া ম্যাম আর কাঠবিড়ালি এল এক তাঁতির বাড়ি সুতো কিনতে। সুতো নিয়ে চলল দর্জির বাড়ি, মানে টুনটুনি পাখির কাছে। সব শুনের টুনটুনির মাথায় হাত। এত তাড়াতাড়ি কী করে বানাবে। কাঠবিড়ালি তার দলবল ডাকল। বনের সব টুনিভাইদের ডেকে আনা হল। সারা রাত ধরে সাদা সাদা কীসব তৈরি হল। পরের দিন সজারুর মা সজারু সিংকে অনেক বুঝিয়ে স্কুলে নিয়ে এলেন। স্কুলে ঢুকতেই দেখা গেল টিকটিকি ঢোল বাজাচ্ছে, ইঁদুরের দল ভেঁপু, কেউ বাঁশি আর বিড়াল ভায়া বিরাট রঙিন কাগজে মোড়া একটা বাক্স সজারু সিংয়ের হাতে দিল। সজারু সিং অবাক। সবাই একসঙ্গে সুর করে বলে উঠল, ‘সরি।’ তারপরই সবাই রঙিন কাগজের বাক্সটি খুলতে বলল। সজারু ভেবে পাচ্ছে না কি বলবে, কী করবে। কচরমচর করে বন্ধুরাই খুলে দিল। সজারু সিং দেখল সবাই মিলে সাদা সাদা ছোটো টুপি ওর কাঁটার মাথায় লাগিয়ে দিচ্ছে। সজারু সিং কিছুটা হতবাক হল। তারপরই সবাইকে জড়িয়ে ধরল। দূর থেকে টিয়াম্যাম আর গরিলা হেড স্যার দেখছেন আর হাততালি দিচ্ছেন।
- রঙিন নুড়ির রাজা । শাশ্বত ব্যানার্জী | Manikarnika.Pub
রঙিন নুড়ির রাজা । শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয় : কবিতা প্রচ্ছদ : শাশ্বত বন্দোপাধ্যায় পরিবেশক : মণিকর্ণিকা প্রকাশনী মূল্য : ₹ ১০০ যোগাযোগ (কল ও হোয়াটস্অ্যাপ) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির দুটি কবিতা এখানে দেওয়া হল। পারাবার একদিন স্যারের বাড়িতে বসে অঙ্কখাতায় নতুন কবিতা লিখেছিলাম। দেখতে পেয়ে, সেই লেখা পড়ে রিন্টুকাকু মাকে বলেছিল, ওর বোধহয় কেউ আছে ... একটু দূরে সাইকেল বার করছিলাম আমি। মা বকেনি। বাড়ি ফিরে শুধু জিজ্ঞাসা – কোথায় মন থাকে আজকাল? চুপ করে আমি ছাদে গিয়ে দাঁড়াই আকাশ যেন ঝাঁকড়া জামরুলগাছ – অন্ধকার ডালপালা, সাদা দপ্দপে ফল ওই দূরের শিকড় নেমে এসে ছুঁয়ে থাকে মুখ মন কোথায়... মন কোথায়... বলতে বলতে দিগন্ত দিয়ে ছুটে যায় ট্রেন খাতাটা মেলে দিই, কে নেমে এসে টিম্টিমে লন্ঠন তুলে ধরে লেখায় – ‘ও আকাশ, একটা ডাকনাম দিও। যে গোপন ডাকনাম দেয়, মনে হয় তার কাছে গিয়ে থাকি, এখন জানলা দিয়ে তোমাকে দেখতে পাই যেন অসুখের খবর-আনা চিঠি ভরে আছে পূর্ণ নীরব এক আলো, আর তারা... তারা... তারা... ও আকাশ, একদিন ডাকনামে ডেকো। তোমার কাছে বসে সেইদিন দেখব গৃহস্থ জানলাখানি শান্ত পাতায় ছুঁয়ে আছে লতাগাছ, মশারির ভেতর ঘুমে বিভোর কটি তারা দেখব ঘুমন্ত ঝাউবন, বাবার সৈকতে এসে চুপ করে ছুঁয়ে থাকে জলে ভেজা মায়ের আঙুল’ ... ঈশ্বর বুড়ুর জন্ম সরস্বতী পুজোর দিন। ওর জন্মদিনে সন্ধেবেলা সকলে মিলে ছাদে বসে মুড়ি মেখে খাই। মুড়ির সঙ্গে শশা পেঁয়াজ টম্যাটো চানাচুর বাদাম। শুক্লাপঞ্চমীর ভরা আলোয় সে বড়ো রূপবান আকাশ। মাদুর বিছিয়ে বসে মা বাবা। আমি চিলছাদে ওঠার লোহার সিঁড়িতে। দাদুর জন্য একটা চেয়ার আসে। বুড়ু আর মণি কার্নিশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঘোরে। বারবার ওদের বাটি রাখার শব্দ হয়। ছাদের আলো জ্বালি না। চাঁদের আলোয় আমাদের বাটিগুলো চক্চক্ করে। এমন মায়ার দিনে খুব সহজেই মানুষ মিশে যায় অন্ধকারে। মনে পড়ে তার – একদিন ওখানেই ছিলাম। অর্চনামাসি আসে। খুনসুটি করে। সাপের বাঁশির মতো জ্যোৎস্না একসময় তাকেও শান্ত করে দেয়। চিলেকোঠার ছাদ থেকে ভাইয়ের গান ভেসে আসে – ওরা পরকে আপন করে, আপনারে পর। হাওয়া দেয়। গান ভেঙে ভেঙে যায়। ভেঙে ধুলো হয়ে যায় এক- ছাদ মানুষের লুকোনো সব ফণা। হঠাৎ কারেন্ট চলে যায়। মণি উঠে গিয়ে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে নিয়ে আসে। ভুলে যায়, শুক্লাপঞ্চমীর ছাদে আলো লাগে না মানুষের। ওই আলোটুকু আমাদের গৃহস্থ ঈশ্বর। চক্চকে বাটি হাতে আমরা তার কাছাকাছি বসি। চারধার নিঃঝুম হলে, বেশ টের পাই আমাদের ঘিরে ধিকিধিকি পুড়ে যাচ্ছে অন্ধকার। ওপরে আকাশভরা তারা, আর গান নিয়ে দাঁড়িয়ে আমার ভাই। আজও। চিলেকোঠা এত আলো চারদিকে, তবু ফুলের ভেতরকার হিম অন্ধকার দিনভর জমে থাকে এইখানে গা ছম্ছম্ করে অকেজো টেলিফোন, সেলাইমেশিন, ভাঙা টেবিলফ্যান আমরা ফিরে গেলে ওরা কথা বলে ঘষা-লাগা বাবার চশমার কাঁচ আম্মার ডাকে-না-ফেলা চিঠির পাঠোদ্ধার করে এতদিনে হলুদ সেই পোস্টকার্ডের গায়ে চ্যাপ্টা প্রজাপতি তার শরীরের কণা কণা রঙ আর আয়ু দিয়ে ঘিরে রাখে কাঙাল অক্ষরমালা আজ আমি বাবার চশমা চোখে পড়ি প্রবাসী কন্যাকে লেখা আম্মার না-পাঠানো কটি লাইন – ‘বুবু, একবার সাধ করে উঠোনের ধারে একটি জামরুল গাছ পুঁতেছিলাম। তুমি তখন পেটে। একদিন সে গাছে ফুল এল। গাছভরা ফুল। ফুল থেকে ফল হওয়াই নিয়ম, আমরাও তো তাই চাই। কিন্তু ওগাছের ফুল বড়ো জেদি। আমৃত্যু ফুটেই রইল। ফল হল না কিছুতেই। এ সংসারে যে ফুল নিয়ম মানে না, জেনো তার দুঃখ অনেক। তার শান্তি নেই ...’ আসন ও-মেয়ে মাঠগ্রস্ত, ও-মেয়ে শুধুই ধুলােধর্ম বােঝে! নামাও। ভাঙো। ঘাের চুরমার করাে—তবে না সহজে থামাতে পারবে ওকে। বলবে, সেই ছেলেকালে আমরাও ছুটেছি অমন। সব জাড় ভেঙে দিকচক্রবালে ও কেন একাই ছুটতে ছুটতে উঠে যাবে? কেন এক অলীক পরশ ঊষালােক হয়ে রােজ ছুঁয়ে দেবে মুখ? খড়ের গাদায় একটিও দোষ খুঁজে পাও যদি, তােমার আমার পাশে ওরও হবে সমান আসন বুকের ভেতর ধিকিধিকি জ্বলে শুধু খড় তােমাকে আমাকে আজ নাচায়-ঘােরায়—আসলে তাে আসনের মন!
- Refund Policy | Manikarnika.Pub
RETURN POLICY Last updated February 14, 2023 Thank you for your purchase. We hope you are happy with your purchase. However, if you are not completely satisfied with your purchase for any reason, you may return it to us for a full refund only. Please see below for more information on our return policy. RETURNS All returns must be postmarked within seven (7) days of the purchase date. All returned items must be in new and unused condition, with all original tags and labels attached. RETURN PROCESS To return an item, please email customer service at nnanage.business.finances@gmail.conn to obtain a Return Merchandise Authorization (RMA) number. After receiving a RMA number, place the item securely in its original packaging and include your proof of purchase, then mail your return to the following address: Magic Seeds Books LLp Attn: Returns RMA # Abhay Patuli Lane, Suksanatantala Chandannagar, West Bengal 712136 India Please note, you will be responsible for all return shipping charges. We strongly recommend that you use a trackable method to mail your return. REFUNDS After receiving your return and inspecting the condition of your item, we will process your return. Please allow at least fifteen (15) days from the receipt of your item to process your return. Refunds may take 1-2 billing cycles to appear on your credit card statement, depending on your credit card company. We will notify you by email when your return has been processed. EXCEPTIONS For defective or damaged products, please contact us at the contact details below to arrange a refund or exchange. Please Note • Sale items are FINAL SALE and cannot be returned. QUESTIONS If you have any questions concerning our return policy, please contact us at: nnanage.business.finances@gmail.conn
- উত্তরে আছে মৌন । সৈকত ভট্টাচার্য | Manikarnika.Pub
উত্তরে আছে মৌন । সৈকত ভট্টাচার্য বিষয় : তিব্বতের ইতিহাসের গল্প প্রচ্ছদ : দেবাশীষ দেব মূল্য : ₹ ৩৫০ মণিকর্ণিকা প্রকাশনী যোগাযোগ (কল ও হোয়াটসএ্যাপ) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির প্রথম অধ্যায় এখানে দেওয়া হল। বোদরাজ্যের রাজা গরম লাগে তো তিব্বত গেলেই পারো! - বিরক্তিভরে কথাটা বলে পাশ ফিরল শুভ। চেন্নাইয়ের গরমে ঘরে বসে সিদ্ধ হচ্ছি সবাই। এই এপ্রিল-মে মাস জুড়ে এখানে যে ‘অগ্নিনক্ষত্রম’ অর্থাৎ সূয্যিমামার চোখ-রাঙানি সহ্য করতে হয়, তার থেকে পরিত্রাণের উপায় ছিল আমাদের আপিস। সূয্যিদেবের ওয়ার্ম আপ করার মধ্যে আপিসের ঠান্ডায় সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ো, আর একেবারে অন্ধকার হয়ে ফুরফুর করে সমুদ্রের বাতাস বইতে যখন শুরু করবে তখন বের হও। এই পলিসি নিয়ে কটা বছর দিব্যি কাটল। এ-বছরটাও আলাদা কিছু হওয়ার কারণ ছিল না যদি না করোনার হামলাটা ঘটত। লকডাউনের চক্করে সবাই ঘর-বন্দি। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরনো না-মঞ্জুর। ব্যাচেলর জীবনের বেসিক নিড - দুবেলার খাবার আর ল্যাপটপ - এসব তো মজুত আছেই। সবজিওলা আর অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যেকার একটা ছোটো দোকান ফ্ল্যাটের দরজায় নিত্যদিনের মাল সরবরাহ করছে। জ্বালা শুধু এই ‘গরমি’কে নিয়ে। বাড়িওয়ালা মিঃ সুধাকর ঘরে একখানা উইন্ডো এসি লাগিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ওভারটাইম খেটে খেটে দিন দুয়েক হল সে-যন্ত্রটি দেহ রেখেছেন। অভ্যেস না থাকলে যা হয়! এই ওয়ান বি-এইচ-কে ফ্ল্যাটে আমরা তিনজনই বাঙালি। ঘরে তিনখানা সিঙ্গল-খাট, বাড়িওলাই পেতে দিয়েছেন। তার একটায় আমি, পাশেরটায় আমার কোম্পানির আইটিতুতো ভাইটি শুভ, আর অন্যটায় জয়দা। জয়দা আমার চেয়ে বছর চারেকের বড়ো। আপিসের কাজের বাইরে ওর একমাত্র এন্টারটেইনমেন্ট হল বই। বাকিসব ইচ্ছে-অনিচ্ছেকে জয়দা কী করে জয় করেছে তা বাতলাতে গেলে ঢাউস উপন্যাস হয়ে যাবে! বেলা খানিক গড়াতেই সেই অকৃতদার ইন্দ্রিয়বিজয়ী অপারজ্ঞানময় উঠে বসে হাতের বইটি বিছানার উপর রেখে পাশে খুলে রাখা স্যান্ডো গেঞ্জি দিয়ে কপাল মুছে যখন বলল, ‘বাপরে! কী গরম রে!’, তখনই সুযোগ বুঝে শুভর টিপ্পনি - গরম লাগে তো তিব্বত গেলেই পারো! জয়দা এমনিতে মিতভাষী, ঘরে আছে না নেই সেটা মালুম হয় না। মোটামুটি বইপত্তরের পাতা, বাঁধাই, অক্ষয়, মায় সিলভার পোকাগুলোর সঙ্গেই ওর মান-অভিমান, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি চলে। কিন্তু একবার যদি ওর সাবজেক্টের মধ্যে কিছু পড়ে যায়, তাহলেই চিত্তির! সঙ্গে সঙ্গে সে-বিষয়ে ওর অর্জিত অঢেল জ্ঞানরাশির বর্ষণ শুরু হয়। বলা বাহুল্য, সেই বর্ষণে আমরা দেদার ভিজি, রীতিমতো সর্দিও লাগে! যেইমাত্র শুভ তিব্বতের নাম নিল - আমি প্রমাদ গুনলাম। গত দুদিন ধরে জয়দা যে-বইটার সঙ্গে উঠছে-শুচ্ছে, মাঝেমধ্যে বাথরুমেও সহগমন করছে, সেটির প্রচ্ছদে বড়ো বড়ো করে লেখা ‘Tibet’ কথাটা লক্ষ্য না করে উপায় নেই। শুভর দিকে কয়েক সেকেন্ড নিষ্পলক তাকিয়ে জয়দা বলল, খুব বুলি ফুটেছে দেখছি! তিব্বত সম্পর্কে কী জানিস শুনি? দলাই লামা জানি, লাসা জানি, চমরীগাই জানি। - শুভর নির্লিপ্ত উত্তর। যাও না! তিব্বতে গিয়ে মুখ ফসকে দলাই লামার নাম বলে দ্যাখো একবার, তারপর চীন কেমন দলাই-মলাই করে বুঝবে! কেন? দলাই লামার কীসব প্যালেস-ট্যালেস আছে না? সব এখন চীনের দখলে। দলাই লামা পালিয়ে এসে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। - বলে মুখে চুকচুক করে একটা শব্দ করে জয়দা আবার বলে, আজকের এই তিব্বত আর স্রোংচান গামপো, ঠিস্রোং দেচেনের তিব্বত! তিব্বতের বিশাল সাম্রাজ্যের বিস্তার চীনকে যে কতবার নাকানি-চোবানি খাইয়েছে তার ইয়ত্তা নেই! এসব গল্প জানিস? শুভ ফটাফট মাথা নেড়ে সারেন্ডার করে দেয়। এইসব ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করে দেওয়াই ভালো। করা উচিত। কিছু তথ্য, কিছু গল্প জানা থাকলেও বলা উচিত অজানা। এই হার মানা কোনো মানুষ বা তার ব্যক্তিগত জ্ঞানের কাছে নয়, গল্পের কাছে। আবহমান কথকতার কাছে। একটা মানুষ যখন কোনো চেনা ইতিহাসই বলতে শুরু করে, তার বলায় এসে লাগে একেবারে নিজস্ব এক সুর, কত জানা ঘটনার অচিন ব্যাখা উঠে আসে বয়ানকালে, হয়তো কথকের অজান্তেই। প্রথম যে-বাঙালি তিব্বত গেছিলেন তার নাম জানা আছে? অতীশ দীপঙ্কর না? - আমি পাশ থেকে ফোড়ন কাটি। আজ্ঞে না। তারও শ-দুয়েক বছর আগে গেছিলেন অতীশের মতোই এক গৃহত্যাগী রাজকুমার। মনে করা হয় তিনি অতীশেরই এক পূর্বপুরুষ। আচার্য শান্তরক্ষিত। প্রায় বাহান্ন বছর বয়সে পায়ে হেঁটে হিমালয় পার হয়ে লাসা পৌঁছেছিলেন। কেন? বুড়ো বয়সে এমন শখ জাগল কেন? - শুভর প্রশ্ন। টেনিদার স্টাইলে একটা হাইক্লাস হাসি হেসে জয়দা বলল, সেটা জানতে গেলে তার অনেক আগের অনেক গপ্পো জানতে হবে। প্রায় দুহাজার বছরের পুরোনো তিব্বতের গল্প। মানে ২০০ থেকে ১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। ভারতবর্ষে তখন কে রাজত্ব করছে বল দেখি? জয়দার প্রশ্নের সামনে আমাদের এক গাল মাছি! বিস্তর ভেবে-টেবে শুভ বলল, হরিশচন্দ্র? ভস্মাসুরের মতো দৃষ্টি হানল জয়দা। চাঁদি-ফাটা গরমটা দুম করে অসহনীয় হয়ে উঠল। ঘরের নৈঃশব্দ্য ভাঙতে আমি মিনমিন করে বললাম, মৌর্য্যরা? এবার যেন একটু খুশিই হলেন মহাজ্ঞান। বললেন, কাছাকাছি। মৌর্য্যবংশের শেষ রাজা বৃহদ্রথকে হত্যা করে মগধের সিংহাসনে বসেছেন পুষ্যমিত্র শুঙ্গ। শুরু হয়েছে শুঙ্গ সাম্রাজ্যের। আমাদের গল্পের শুরুও সেই সময়... ‘শুঙ্গ’ শুনে কেমন একটা শুঁড়ওলা আরশোলা মনে হচ্ছে না? - আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকাল শুভ। আহ! খালি বাজে কথা! - জয়দার গলায় একটা ছোটো হুংকার। আচ্ছা আচ্ছা, কন্টিনিউ। পুষ্যমিত্র ছিলেন বৃহদ্রথের সেনাপতি। বৃহদ্রথ বছর সাতেক রাজত্ব করেছিলেন। তারপর একদিন যখন মন দিয়ে মিলিটারির প্যারেড দেখছিলেন, সেনাপতি পুষ্যমিত্র এসে ঘচাং ফু করে দেয়। এ কী! ঘচাং ফু করলেই হল? রাজার সিক্রেট সার্ভিস ছিল না? - শুভ উত্তেজিত। কে জানে, ছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু তারাও হয়তো পুষ্যমিত্রর পুষ্যি ছিল। এসব রাজা-গজার তো শত্রুর অভাব নেই! আসল কথা হল ক্ষমতার লোভ! পুষ্যমিত্র হলেন মগধের সিংহাসনে আসীন প্রথম ব্রাহ্মণ রাজা। ওদিকে মৌর্যরা ছিল বৌদ্ধ। ফলে বৌদ্ধরা এতদিন রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় নানারকম সুবিধা পেয়ে এসেছিল। এ ব্যাটা শুঙ্গ সিংহাসনে বসেই বৌদ্ধধর্মকে নির্মূল করে ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘারাম-টংঘারাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করতে শুরু করে দেন... খোদ পাটলিপুত্রেই এক সংঘারামকে জ্বালিয়ে দিয়ে তার সব বৌদ্ধ সন্নাসীদের হত্যা করে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছিলেন... আমরা আবার বখতিয়ার খিলজিকে খিস্তি করি! ছোঃ! আচ্ছা, তিব্বতের রাজারাও তো বৌদ্ধ ছিলেন? তাহলে এখান থেকেই কি কেউ তিব্বতে গিয়ে… - প্রশ্ন করি আমি। প্রথম প্রশ্নের উত্তর পার্শিয়ালি ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর ‘হয়তো হ্যাঁ’। জয়দা জবাব দেয়। ওর গলায় বেশ একটা ব্যাখ্যা আর গল্প-বলার আগ্রহ ফুটে উঠেছে। মানে? মানে তিব্বতি রাজারা বৌদ্ধ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু সেটা আরও অনেক পরে সেটা। তা ধর… হ্যাঁ, আরও ছ-সাতশো বছর পর তো হবেই। তার আগে হারগিজ নয়। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে ‘হয়তো’র কারণটা হল অন্তত সাতশো খ্রিস্টাব্দের আগে অবধি তিব্বতের লিখিত কোনো ইতিহাসই নেই। কেন? কেন? - দুজনেই প্রায় হায় হায় করে উঠি। শুধু ইতিহাস কেন, লিখিত কিছুই পাবি না। কেন বল তো? আমরা খচখচিয়ে মাথা চুলকোচ্ছি, এমন সময় ওড়িয়া ঠাকুর রবি এসে ঢুকল। রবির ভালো নাম রবি দাস। আমরা ‘রবি ঠাকুর’ বলেই ডাকি। সে এসে দন্ত বিকশিত করে বলল, ভাইয়া, খানা লগা দিয়া। শুভ মাথা চুলকোবার আগে গেঞ্জির তলায় হাত ঢুকিয়ে পেটও চুলকোচ্ছিল। খাবারের নাম শুনে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। আমারও যে খিদে পায়নি একেবারে তা নয়। শুধু জয়দাই অপার নিস্পৃহতার সঙ্গে বলল, কাল তো থোড় বড়ি খাড়া হয়েছিল, আজ কি খাড়া বড়ি থোড়? রবি বালাসোরের লোক হওয়ায় বাংলাটা বুঝতে পারে, তবে ভালো কইতে পারে না। জয়দার প্রশ্ন শুনে বুক ফুলিয়ে শুঙ্গ-মার্কা মুখ করে বলল, কাতলা মাছের ঝোল! ঘ্যাঁট আর ভাত খাওয়া মুখগুলো মাছের নাম শুনে প্রায় এক-বিঘৎ করে হাঁ হয়ে গেল! এগুলো মাছের পিস? - ইঞ্চিখানেক লম্বা আর বোধহয় কয়েক মাইক্রন চওড়া একটা গাদা দুআঙুলে তুলে বলল শুভ। চেন্নাইয়ের মাছওলাদের সমস্যা হল এরা এক্কেবারে মাছ কাটতে পারে না। বলা বাহুল্য আমার থালাতেও মাছের যে ছিটেফোঁটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি পড়েছে, সেগুলিকে দেখে যে কেটেছে তার প্রিসিশনের প্রতি সম্ভ্রম ব্যতীত আর কিছু মনে আসছিল না। জয়দার এসবে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই! ও দেখি থালাখানেক ভাত শুধু ওই দিয়েই সাপটে একটা আলু মুখে পুরে চোখ দুটো আধেক বুজে চিবোচ্ছে! আমার প্রশ্নের উত্তরটা কিন্তু এখনও পাইনি। - সে অবস্থাতেই আলুটাকে সম্ভব গলায় চালান করে দিয়ে কথাটা বলল জয়দা। এই এক সমস্যা লোকটার, কিছু একটা মুখ থেকে বেরুল তো জবাব না পেলে শান্তি নেই। দুহাজার বছর আগে তিব্বতে কেন মানুষ লেখাপড়া করেনি আমি কেমন করে জানব বলুন তো? আমাদের পাড়ার পিন্টুও একবর্ণ লিখতে জানে না - হরিতলায় চুল কাটে - কিন্তু কেন জানে না, তা কি কোনদিন ওকে জিজ্ঞেস করতে গেছি? কী করে জানব? - বেজার মুখে বলি। ভাব, ভাব। লক্ষণ সেনের মতো অমন সারেন্ডার করিস না। - বলে জয়দা মুখে একটা দিব্যভাব এনে বেসিনে গিয়ে ফুচুৎ ফুচুৎ করে কুলকুচি করতে লাগল। আমি আর শুভ মুখ চাওয়াচায়ি করছি, জয়দা তোয়ালে দিয়ে মুখটা মুছে, ‘ঘ্রাউউৎ’ করে একটা পেল্লায় ঢেকুর তুলে বললেন, লেখার জন্য কী প্রয়োজন? আমি বললাম, কালি। শুভ উত্তর দিল, মানুষ। জয়দা বলল, আরও বেসিকে যা। কী না হলে লেখা হবেই না? কালি ছাড়া পাথরে কুঁদেও লেখা যায়। আর মানুষ ছাড়া কি তোর মত উল্লুক এসে লিখবে? পরক্ষণেই আমাদের বুদ্ধির উপর ভরসা ছেড়ে জয়দা নিজেই বলল, অক্ষর। লিপি। স্ক্রিপ্ট। অক্ষর না থাকলে লিখবে কী করে? তিব্বতি ভাষার কোন লিপি ছিল না। অনলি কথ্যভাষা। তাই শুধু ইতিহাস কেন, কিছুই লেখা হয়নি হাজার হাজার বছর ধরে। ফলে দেশটার ইতিহাস পুরো অন্ধকারে ঢাকা। পরে রাজা স্রোংচান গামপোর সময় লিপি তৈরি হয়। সে-গল্প যথাসময়ে বলব। কিন্তু তারপরেও যা ইতিহাস লেখা হয়েছে, সবই প্রায় ধর্মীয় ইতিহাস। তার মধ্যে ধর্মীয় উপকথা, গল্প-কাহিনি এত মিলেমিশে গেছে যে আসল ঘটনা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর! লিপি কেমন করে তৈরি হয়? - প্রশ্ন করলাম আমি। রহু ধৈর্যং। আগের কথা আগে বলি। বেশ। মুখে আনার দানা ফেলে চুষতে চুষতে আমরা আবার ঘরে ফিরে গল্পের লোভে গ্যাঁট হয়ে বসলাম । জয়দা পাশের বালিশটা কোলে টেনে নিয়ে গুছিয়ে বসে বলে চললেন, এদিকে পুষ্যমিত্র শুঙ্গ যখন কেলোর কীর্তি করে বেড়াচ্ছেন, তখন তিব্বতের প্রথম রাজা 'ঞাঠি চানপো'র আবির্ভাব। আবির্ভাব? ভগবান নাকি? - হ্যা হ্যা করে খানিক হেসে নিল শুভ। ইয়েস। ভগবান। অন্তত তিব্বতিরা সেরকমই ভেবেছিল। আসলে উনি তিব্বতি ছিলেন না। সম্ভবত উত্তরভারতের কোনও রাজ্য থেকে হিমালয় পার হয়ে তিব্বতে পৌঁছন। পায়ে হেঁটে। পায়ে হেঁটে এভারেস্ট পার হয়ে গেল? তাহলে তো তেনজিঙের আগে… - শুভ হতঅবাক। এভারেস্ট কেন পার হতে যাবে? তাহলে? তিব্বত যাবে কী করে? কেন? কলকেতা, ডায়মণ্ডহারবার, রানাঘাট, তিব্বত, ব্যস! সিধে রাস্তা, সওয়া ঘণ্টার পথ, গেলেই হল। - বলেই খ্যাঁকখ্যাঁকিয়ে একটু হেসে নিল জয়দা। ভাবখানা এই যে শুভর উপর ভালো শোধ নেওয়া গেছে। হাসি-টাসি শেষ হলে আবার গম্ভীরভাবে বলল, অনেক গিরিপথ আছে। তবে অত বছর আগে কীভাবে কোন পথে গেছিল এখন বলা যাবে না। হিমালয়ের মত নবীন পর্বত - রোজই ভাঙছে-গড়ছে। মনে নেই, সেই যে বলেছিলাম সেবার গোমুখে গিয়ে দুর্যোগে আটকে গেলাম, তারপর তো গোমুখ যাওয়ার রাস্তাটাই বদলে গেল। তাই দুহাজার বছর আগে সে ভদ্রলোক কোন রাস্তায় যে ওখানে গিয়ে পৌঁছেছিলেন তা এখন বলা মুশকিল। কিন্তু উনি গেছিলেন। কেন গেছিলেন - সে ব্যাপারে নানা মুনি নানা মত। অনেকে বলেন এখানকার কোনো রাজ্যের রাজা ছিলেন, শত্রুর হাত থেকে পালানোর জন্য রমণীর ছদ্মবেশে পাহাড় টপকে হাজির হন ওপারে। আবার অনেকে পুরাণের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছেন ইতিহাসকে। তারা বলেন উনি নাকি কোশলরাজ প্রসেনজিতের কোনো এক উত্তরসূরি, নাম ‘বুদ্ধশ্রী’। বিরোধীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য নারীর ছদ্মবেশ নিয়ে পালিয়েছিলেন। কেউ বলেন উনি ছিলেন কৌরবপক্ষের এক রাজা, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে লড়েছিলেন, শেষে পাণ্ডবরা জিতে যাওয়ায় তাদের হাত এড়ানোর জন্য একেবারে তিব্বত। মোদ্দা কথা হল, উনি যেই হোন না কেন, শত্রুর হাত থেকে চাচা আপন প্রাণ বাঁচা বলে হাজির হয়েছিলেন হিমালয় টপকে সেই ‘বোদরাজ্যে’। কী? বোদরাজ্য? সে আবার কী? এই যে বললে তিব্বত! - আমি নাক কুঁচকোলাম। যাহা বাহান্ন, তাহা তিপ্পান্ন! আচ্ছা, চট করে একটা ক্যুইজ হয়ে যাক - ভারতবর্ষের আগে কী নাম ছিল? শুভ তাড়াহুড়োয় ‘জম্বুদ্বীপ’ বলতে গিয়ে বলে ফেলল ‘জাম্বুবান’। আমি খোঁচা দিয়ে বললাম, তোর না, ভারতবর্ষের নাম জিজ্ঞেস করেছে! ও কেমন একটা হৃদি-ভাঙা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, এৎ তু ব্রুতে! আহ! এত বাজে বকলে কি আর হিস্ট্রি চোখে দেখবার এনভায়রনমেন্ট তৈরি হয় রে! - গম্ভীর গলায় একটা মিনি হুঙ্কার ছেড়ে জয়দা বালিশের তলা থেকে একটা আধখাওয়া সিগারেট বের করে সেটা খুব কায়দার সাথে নাকের তলায় ঘষতে লাগল। আমি বললাম, সিগারেটেও রেশন করছ? হুঁ, লাইটার দিয়ে সিগারেটটা ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে ঘরটাকে ধোঁয়াময় করে আমাদের কাশিয়ে টাশিয়ে একসা করে গুরুদেব বলল, রেশন না করলে আমার সিগারেটর সাপ্লাই কোথা থেকে আসবে শুনি? আন্না তো দোকানের ঝাঁপ ফেলে তিরুনালভেলি চলে গেছে। বুঝলাম সমস্যা গভীর! কথা না বাড়িয়ে বলি, তারপর? ঞাট্রি কানকো কোথায় একটা পৌঁছল... কানকো! তোর কানকো কেটে নেব! চানপো। ইংরিজিতে লিখলে হয় Tsanpo. এ কী! সেটার উচ্চারণ তো… উচ্চারণ তো... - এইটুকু বলে জিভ দিয়ে টাকরায় কেমন একটা অদ্ভুত শব্দ বের করতে লাগল শুভ। জয়দা সেটা দেখে হেসে বলল, হচ্ছে না তো? হবে না... ওটার উচ্চারণ চানপোই হয়। যেমন সিকিমে ছাঙ্গু লেকে গেছিস তো, অথবা পেমিয়াংচি গুম্ফা? বানানগুলো দেখেছিস? ‘Tsa’ দিয়েই লেখা হয়। আসলে এটা একটা তিব্বতি বর্ণ যার উচ্চারণ বাংলা 'চা' বা 'ছা'-এর কাছাকাছি। টেরি ওয়াইলি নামে এক মার্কিন তিব্বত-বিশেষজ্ঞ তিব্বতি হরফগুলিকে ইংরিজিতে ট্রান্সলিটেরেট করেন। সম্ভবত ১৯৫৯ সাল নাগাদ। এটাকে ওয়াইলি (Wylie) ট্রান্সলিটেরেশন বলা হয়। বুঝলি? শুভ ঢক করে মাথা নেড়ে দিল। জয়দার সিগেরেটটা এত কথার ফাঁকে অর্ধেক থেকে এক চতুর্থাংশ হয়ে গেছে। আগুনটা ফিল্টারে ঢুকব ঢুকব করছে। জয়দা একটা যাকে বলে বুক ভরা টান দিয়ে ক্যারমের স্ট্রাইকারের মত জানলা দিয়ে ফিল্টারটা ফেলে দিল। ও কী! কার মাথায় পড়বে ঠিক আছে? অমন করে ফেলতে বারণ করেছি না!¾হাঁ হাঁ করে উঠলাম আমি। পড়বে না!—চোখ বন্ধ করে একগাল হেসে জয়দা বলল, ম্যাক্সিমাম আমাদের কার্নিশেই পড়ে আছে। দেখ। ইনিশিয়াল ভেলোসিটি, এঙ্গেল সব মেপে প্রোজেক্টেইলের অঙ্ক কষেই তো ছুঁড়ি যাতে ঠিক কার্নিশে ল্যান্ড করে! যাক গে... যেটা বলছিলাম... ‘বোদ’ - তিব্বতের প্রাচীন নাম। অনেকে ‘বোদ’ না বলে… যাক গে, সেটা আবার বাংলায় শুনলে নামের চেয়ে বেশি বদনাম মনে হবে। বাদ দে। ‘বোদ’ কথার অর্থ সম্ভবত ‘প্রাচীন ভূমি’ বা ‘আদি বাসস্থান’ জাতীয় কিছু। সেটা নিয়ে বিস্তারে পরে বলছি। এখন আমাদের রাজামশাই হিমালয় টপকে চলেছেন বোদরাজ্যে, আপাতত সেখানে ফিরে আসি। যদিও এসবই গল্পকথা, কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। প্রায় সাত-আটশো বছর পরে লিখিত ইতিহাস নির্ভর করে এসব ধারণা পাওয়া গেছে। সে-ইতিহাসও কতটা ভরসাযোগ্য—বলা মুশকিল। কেন? - জিজ্ঞেস করি আমি। কারণ - ধর্ম। পৃথিবীতে ইতিহাস যা লেখা হয়েছে তার অধিকাংশই রাজার অ্যাপয়েন্ট করা ঐতিহাসিকের লেখা। ফলে রাজনৈতিক কথা বেশি পাওয়া যায়। আর কিছু ইতিহাস লেখা হয় ধর্মের প্রভাবে। যেমন তিব্বতে লেখা হয়েছিল। বৌদ্ধধর্ম সেখানে প্রসারিত হওয়ার পর ইতিহাস লেখা শুরু হয়, আর লেখেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাই। উভয়ক্ষেত্রে পক্ষপাত থাকলেও, রাজনৈতিক প্রভাবে হয়তো রাজার নামে প্রচুর ভালো ভালো কথা থাকতে পারে, কিন্তু উদ্ভট অতিমানবিক গল্পকথা থাকে কম, যেটা বিস্তর রয়েছে তিব্বতের ইতিহাসে। ফলে গল্প সরিয়ে সত্যি ঘটনাকে বুঝতে পারা একটা বিশাল চ্যালেঞ্জ। বুঝলি? বুঝলাম। তাহলে ঞাঠি চানপোর সময়কাল বা এই ভারত থেকে আসার ঘটনা সত্যি নাও হতে পারে? - আমি শুধোলাম। এমনকি ওইরকম কোনো লোকের অস্তিত্বই হয়তো ছিল না। তাও হতে পারে! ইনফ্যাক্ট বর্তমান পণ্ডিতদের মতে তিব্বতের প্রথম রাজা স্রোংচান গামপো সেভেন্থ সেঞ্চুরির। ঞাঠি চানপোর গল্প বানিয়েছেন বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা। আর দুজনের মধ্যেকার লম্বা সময়টাকে মেক আপ দিতে আরও বিশ-পঁচিশখানা রাজার নাম বিভিন্ন স্থানীয় প্রাচীন লোককথা থেকে তুলে স্রেফ বসিয়ে দেওয়া হয়েছে - কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি ছাড়াই। এ বাবা! এইভাবে ইতিহাস রচনা হয়েছে! এ তো পাতি ব্যাক ক্যালকুলেশন! - শুভ মন্তব্য করল! একদম। গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে জয়দা আবার শুরু করল - হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম। এইসব জল মেশানো ইতিহাসের সত্যমিথ্যা বিচার করা খুবই মুশকিলের কাজ। অবিশ্যি সেসব কঠিন কর্ম পণ্ডিতেরা বিস্তর করেছেন। এখনও করে চলেছেন। এটা ওদের পড়াশোনার কাজের মধ্যেই পড়ে। কদিন আগেই এক টিবেটোলজিস্টের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ইমেলে। ভদ্রলোকের নাম স্যাম ভ্যান শাইক। ইউনিভার্সিটি অফ ম্যানচেস্টার থেকে তিব্বতি বৌদ্ধ সাহিত্য নিয়ে ডক্টরেট। জাতে ব্রিটিশ। বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্রেরিতেই প্রোজেক্ট ম্যানেজার হিসাবে কর্মরত। স্যামের একটা রিসার্চ পেপার আমার হাতে আসে। একদম হালে প্রকাশিত। সেইটার কথা পরে বলব। আসলে, ওটা উলটে-পালটে দেখতে দেখতেই তিব্বতের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে বেশ আগ্রহ জন্মাল। ভদ্রলোক সদাশয় ব্যক্তি। মেইল করে কিছু জানতে চাইলেই ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে গুছিয়ে উত্তর চলে আসে। স্যামের যে-কাজটার কথা জেনে আমার এই উৎসাহ, সেটা আসবে আমাদের গোটা গল্পের শেষদিকে। এখন আপাতত ফেরা যাক রাজা রূপতির গল্পে। এই রূপতি আবার কার পতি? এক্ষুনি তো অন্য একটা কার কথা হচ্ছিল! - শুভ আবার গল্পে মজ্জমান! রাজা রূপতির কাহিনি পাওয়া যায় ‘দ্য রেড এন্যাল্স’ নামে একটি বইয়ে। কুঙ্গা দোরজে নামে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ১৩৪৬ থেকে ১৩৬৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এ-বইখানা লেখেন। ভদ্রলোক অবশ্য শেষবয়সে এসে সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। তার আগে দীর্ঘদিন কাটিয়েছিলেন মোঙ্গল রাজপরিবারে। সেটা ইমপর্ট্যান্ট নয়, গুরুত্বপূর্ণ হল এই গ্রন্থকে বলা হয় তিব্বতের ইতিহাসের এক আকর গ্রন্থ। এর আগে যা লেখা হয়েছে, সেসব তেমন খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটাই তিব্বতের বৌদ্ধ ইতিহাসের প্রাচীনতম গ্রন্থ যা বর্তমান ঐতিহাসিকদের হাতে এসেছে। জয়দা একটা বালিশ টেনে নিয়ে কাত হয়ে আধশোয়া হল। এতক্ষণ বসে থেকে কোমর ধরে গেছে। আমিও হেলান দিয়ে বসলাম। জয়দা আবার বলতে লাগল - এখানে বলছে রাজা রূপতি ছিলেন কৌরব পক্ষের এক রাজা। কৌরবদের সঙ্গে জুটেছিলেন নিজের আখের গোছাতে। যেই দেখেছেন কৌরবরা পাণ্ডবদের কাছে ব্যাপক ঝাড় খাচ্ছে অমনি কেটে পড়েছিলেন। য পলায়তি স জীবতি। উনি নারী ছদ্মবেশে পাণ্ডবদের হাত থেকে পালিয়ে হাজির হলেন হিমালয়ে। এটা গল্প নম্বর এক। গল্প নম্বর দুই - যেটা আগে বলছিলাম। কোশলরাজ প্রসেনজিতের এক বংশধরই হিমালয় পার হয়ে তিব্বতে পৌঁছেছিলেন। কোশলরাজ প্রসেনজিতের বংশধরকে প্রথম রাজা সাজানোর পেছনে আবার একটা উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছেন অনেক ঐতিহাসিক। তারা বলছেন, যেহেতু কিছু শতাব্দী পরে এইসব ঘটনার কথা লিখে গেছেন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাই, তাই তারা যে নিজেদের ধর্মকে মহিমান্বিত করার চেষ্টাতে রত ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। ইক্ষ্বাকু বংশের রাজা প্রসেনজিত ছিলেন বুদ্ধদেবের একজন প্রিয় শিষ্য। মগধরাজ বিম্বিসারের শ্যালক। সাঁচি স্তূপের বিখ্যাত তোরণগুলির একটিতে বুদ্ধের সাথে প্রসেনজিতের সাক্ষাতের চিত্রও খোদিত আছে। সুতরাং বুঝতেই পারছিস - তার সঙ্গে তিব্বতি রাজবংশকে যুক্ত করে তার গৌরববৃদ্ধি করা এই কাহিনি নির্মাণের উদ্দেশ্য হওয়াটা আশ্চর্য নয়। গল্প তিন - প্রাচীন তিব্বতে যখন দৈত্য- দানো ঘুরে বেড়াত, সেই সময় বৎসরাজ মৎসরাজ? মানে ইলিশ? - হঠাৎ যেন স্বপ্ন থেকে জাগরণ ঘটল শুভর! হে ঈশ্বর! ওরে হতভাগা একটু ইতিহাস বইয়ের কথা মনে কর। খালি খাই খাই! ষোড়শ মহাজনপদের নাম মনে আছে? শুভ মাথা নেড়ে দিল। মনে নেই। আমারও মনে নেই। দু একটা নাম মনে পড়ছিল। গান্ধার, কোশল... আর কীসব ছিল না? কাকা কোথায়? কমল কুমার অন্য অন্য অনেকের চেয়ে বেশি শুনেছেন। মামার গায়ে পায়ে মস্ত মস্ত বিছে! - জয়দা মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কী একটা বলল, আমাদের দুজনেরই শুনে মনে হল তিব্বতি ভাষা! এটা কী জয়দা? - মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করি। ষোড়শ মহাজনপদ! প্রতিটা মহাজনপদের নামের শুরুর একটা করে বর্ণ দিয়ে লেখা ত্রিবাক্য। কাশী, কোশল, কম্বজ, কুরু, অঙ্গ - যার থেকে ‘বঙ্গ’ শব্দটির উৎপত্তি ধরা হয়, অস্মক, অবন্তী, চেদি, বৎস, শূরসেন, মল্ল, গান্ধার, পাঞ্চাল, মগধ, মৎস, বৃজি! বাপরে! এতগুলো নাম মনে আছে? হ্যাঁ। চেষ্টা করলেই থাকে। নিজেদের দেশের ইতিহাস ভুললে চলে? এই বলে একটা ইঞ্চি পাঁচেক লম্বা হাই তুলে জয়দা বলল, এই ষোড়শ মহাজনপদের একটা ছিল ‘বৎস’। অবিশ্যি মৎস্য নামেও একখানা ছিল, যদিও সেটা ইলিশ নয়। এনি ওয়েজ, এই বৎসরাজ উদয়নের এক পুত্র জন্মায়। রাজপুত্র জন্মালে দেশে আনন্দের জোয়ার বয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বইল না। কারণ যে জন্মাল সে এক বিকৃতদেহ মানুষ। চোখের পাতাগুলো নাকি নীচের দিকে আটকানো, উপরদিকে বন্ধ হয়। হাতের পায়ের আঙুল সব ব্যাঙের মতো - পাতলা মেমব্রেন দিয়ে জোড়া। এমন চেহারার ছেলে দেখে রাজা খুব ভয় পেয়ে আদেশ দিলেন - এই পুত্রকে নদীতে ভাসিয়ে দাও। কর্মচারীরা সেই আদেশ পালন করল। কিন্তু একটি দুধের শিশু, সে যতই বিকৃতদেহধারী হোক না কেন, তাকে অমনভাবে ভেসে যেতে দেখে এক কৃষকের মায়া হল। সে বাচ্চাটাকে নদী থেকে তুলে নিয়ে লালন-পালন করল। পরে বড়ো হলে এই সব ঘটনা জেনে সে মনের দুঃখে হিমালয়ে চলে যায়। তারপর একদিন হিমালয় পার হয়ে হাজির হয় সোজা তিব্বতে! তারপর? অচেনা একটা দেশ। মানুষজনের দেখা পাওয়া যায় না। দিগন্ত বিস্তৃত মালভূমি, পাহাড়। রুক্ষ শীতল জায়গা সব। ঘুরতে ঘুরতে চানথাং গোশি বলে একজায়গায় দেখা হয়ে গেল একদল মানুষের সঙ্গে। তারা ছিল বোন পুরোহিত। কী পুরোহিত? - শুভর জিজ্ঞাসা। বোন। তিব্বতের প্রাচীন ধর্ম। ভাইও আছে নাকি? - নিমেষে বদবুদ্ধির পোকা কিলবিলিয়ে উঠল শুভর মাথায়। জয়দা অবশ্য সেটাকে অত পাত্তা দিল না। বলল, বোন নিয়ে বিস্তারিত পরে বলছি। এটুকু শুনে রাখ যে বৌদ্ধধর্ম প্রবেশ করার আগে বোনই ছিল তিব্বতের জাতীয় ধর্ম। সেই ধর্মের কয়েকজন পুরোহিতের সঙ্গে মোলাকাৎ হল আমাদের রাজপুত্তুরের। তারা তো অমন অদ্ভুত গড়নের মানুষ দেখে অবাক। এ আবার কে! কোত্থেকে উদয় হল! তারা এসে স্থানীয় ভাষায় জিজ্ঞেস করল, কে তুমি? এ তো কিছুই বুঝল না। শেষে নাকি হাত তুলে আকাশের দিকে দেখিয়ে বোঝাল যে সে ঈশ্বর দ্বারা প্রেরিত হয়ে এখানে হাজির হয়েছে। যদিও আমার বিশ্বাস যে ওদের ভাষা না বুঝে কৃষক-পালিত রাজপুত্র হাত তুলে বোঝাতে চেয়েছিল যে সে সুদূর ভারতবর্ষ থেকে এসেছে। কিন্তু পুরোহিতেরা বুঝল উল্টো। অবিশ্যি তাতে ক্ষতি কিছু হল না! ঈশ্বর-প্রেরিত এই আশ্চর্যদর্শন মানুষকে নিজেদের মধ্যে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল তারা। সবাই মিলে তাকে কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে চলল নিজেদের গ্রামে। সেখানে গিয়ে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে জানিয়ে দেওয়া হল যে এই দেবপুরুষ আমাদের রাজা। নাম হল ‘স্কন্ধবাহিত শক্তিধর’ যার তিব্বতি অনুবাদ ‘ঞাঠি চানপো’। বাপরে! এত কিছু ডিটেইলে জানা গেল কী করে? কিছুই জানা যায় নি। আট-ন’শো বছর পর সম্রাট রলপাচেনের সময় তিব্বতের ইতিহাস যখন প্রথম লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু হল তখন মুখে মুখে চলে আসা এইসব উপকথা স্থান করে নিয়েছে ইতিহাসে। তারপর কী হল? তারপর নির্বিঘ্নে রাজত্ব চলতে লাগল। তিব্বতিরা নির্দ্বিধায় ঞাঠি চানপোকে তাদের প্রথম রাজা হিসাবে মেনে নিয়েছে। তার অবিশ্যি কারণ আছে। তিব্বত তখন একটা দেশ বা রাজ্য হিসাবে ছিল না। বারোখানা ছোটো রাজ্য ছড়িয়ে ছিল তিব্বত জুড়ে। তার মধ্যে একটি ছিল এই ইয়ারলুংদের। এদের বাস ছিল ইয়ারলুং উপত্যকায়। সে-উপত্যকার বুক চিরে বয়ে যেত ইয়ারলুং সাংপো নদী। সাংপো, মানে, ব্রহ্মপুত্র? - আমি জিজ্ঞেস করি। ভূগোলে পড়েছিলাম মনে পড়ল। তিব্বতি ভাষায় ‘সাংপো’ মানে নদী। যেমন শতদ্রুর তিব্বতি নাম ‘লাংকেন সাংপো’ বা সিন্ধুর নাম ‘সেংগে সাংপো।’ ব্রহ্মপুত্রর নাম ‘ইয়ার্লুং সাংপো’। আর এর অববাহিকাকে সেই জন্য ‘ইয়ার্লুং অববাহিকা’ বলা হয়। যাই হোক, এই ইয়ারলুং গোষ্ঠীর রাজারাই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্মকে তিব্বতে প্রসারিত করার উদ্যোগ নেন। আর বাকিদের থেকে শক্তিশালী হয়ে লাসা নগরীর প্রতিষ্ঠা করে জাঁকিয়ে বসেন। সেই জন্য এদের পূর্বসূরী হিসাবে ঞাঠি চানপো পেয়ে গেছেন প্রথম রাজার মর্যাদা। অনেকে বলেন ঞাঠি চানপোর আসল নাম, মানে ভারতবর্ষে থাকাকালীন নাম ছিল, ‘বুদ্ধশ্রী’। যদিও এসবের পরেও তিব্বতের ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত প্রথম সম্রাট স্রোংচান গামপো অবধি একটা কয়েকশো বছরের গ্যাপ। তাহলে বৌদ্ধধর্মটা পৌঁছল কবে তিব্বতে? ধৈর্য ধর। এ-উত্তর পেতে গেলে এখনও অনেক শতাব্দী পার হতে হবে। শুভ অনেকক্ষণ ধরেই উশখুশ করছিল। গল্প শুনতে শুনতে বিকেল পার করে ফেলেছি খেয়ালই নেই। জয়দা একটু থামতে এবার ও বলেই ফেলল, বলছি তিব্বতিরা চা খায়? হ্যাঁ! চা খায় কী রে! চা ওদের প্রায় স্টেপলের পর্যায়ে পড়ে! ঠান্ডায় জলের বদলে বারবার চা খাওয়াটাই ওরা প্রেফার করে বেশি। চমরীগাইয়ের দুধের থেকে তৈরি মাখন দেওয়া চা! - জয়দা চোখ বন্ধ করে চমরীগাইয়ের দুধের মাখনের ব্যাপারটা একটু অনুভব করবার চেষ্টা করল। করুণমুখে শুভ বলল, তা চমরীগাই না হলেও আমরা একটু চেন্নাইগাইয়ের দুধের চা কি খাব না?
- About | Manikarnika.Pub
Manikarnika Prakashani Office Adress - 119, Abhay Patuli Lane, Sukhsanatantala, Chandannagar Hooghly. Email us at - manikarnika.pub@gmail.com Call us on - 8240333741
- Contact us | Manikarnika.Pub
Contact This is your Contact section paragraph. Encourage your reader to reach out with any questions or comments. Contact Details First Name Last Name Email Phone Message Send Thanks for submitting!
- About Us | Manikarnika.Pub
About Us A bilingual (Bengali and English) book publication centered at Chandannagar in Hooghly district, West Bengal, India. Our titles are available from our online store ('Buy our titles'), Amazon.in and from several physical outlets at College Street, Kolkata. In addition, we promptly ship books ordered at our WhatsApp no: 8240333741. Inviting original manuscripts and translation works encompassing Novels, Short stories, Essays, Personal Proses, Poetry, Travel Stories, and any kind of thoughtful content. Email us your manuscript at : manikarnika.pub@gmail.com
- পালামৌ । সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | Manikarnika.Pub
পালামৌ । সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিষয় : ভ্রমণকাহিনি প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: ঋভু চৌধুরী নামাঙ্কণ : শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায় মণিকর্ণিকা প্রকাশনী মূল্য : ₹ ২০০ যোগাযোগ (Call or WhatsApp) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির একটি অংশ এখানে দেওয়া হল। ‘পালামৌ’ আখ্যানটি ইতোমধ্যে কয়েকবার বই রূপে প্রকাশিত, এবং বর্তমানেও সুলভ। তবু পাঠ-অভিজ্ঞতাকে ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা করে তোলবার প্রেরণায় তাড়িত হয়ে পরিচিত সে ভ্রমণকাহিনির আরেকটি সংস্করণ প্রকাশ করছে মণিকর্ণিকা প্রকাশনী। আশ্চর্য লেখাটির সঙ্গে সাজিয়ে দেওয়া হল শিল্পী ঋভু চৌধুরীর মোমরঙে আঁকা কয়েকটি সজীব ছবি, প্রচ্ছদে রইল তাঁরই একটি ছবি। নির্জন পালামৌ অঞ্চলে পাঠকের যাত্রাটি হোক রূপময় ও তথ্যভারহীন, এমনটাই আমাদের অভিলাষ। সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনাটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় (পৌষ ১২৮৭ – ফাল্গুন ১২৮৯), ছয়টি পরিচ্ছেদে; সেই পাঠই প্রকাশ করা হল। পুরোনো বানান রইল অবিকল। একটি জায়গা পাঠককে বর্তমান নামে চেনানোর জন্য শুধু একস্থানে যুক্ত হল প্রয়োজনীয় ফুটনোট। পড়বার সময় অক্ষর-রেখা-ছবি-পাতা ছাপিয়ে এই বই যদি হয়ে ওঠে এক আক্ষরিক অঞ্চল- বৃক্ষে আকীর্ণ, ‘মধুদ্রুম’-এর ফুলে রঙিন, ও ‘মৌয়া’গন্ধে আকুল- তাহলে পুনর্প্রকাশ সার্থক হয়। প্রকাশক
- স্মৃতির রেখা । বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় | Manikarnika.Pub
স্মৃতির রেখা । বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিষয় : দিনলিপি প্রচ্ছদ : শাশ্বত বন্দোপাধ্যায় মণিকর্ণিকা প্রকাশনী মূল্য : ₹ ২৫০ যোগাযোগ (কল ও হোয়াটস্অ্যাপ) : 8240333741 আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির একটি অংশ এখানে দেওয়া হল। কাল তোমাকে দেখতে পেয়েছি। শেষরাত্রের কাটা-চাঁদের ও শুকতারার পেছনে তুমি ছিলে। এই শেষ রাতের আকাশের পেছনে, এই ফুল ফোটা নিমগাছের ডালের সঙ্গে, এই সুন্দর শান্ত ঘন নীল আকাশে এক হয়ে কেমন করে তুমি জড়িয়ে আছ। কত প্রাণী, কত গাছপালার বংশ তৈরী হ’ল, আবার চলে গেল - ঐ যে পায়রাদল উড়ছে, ঐ যে নারকেল গাছটার মাথা ভোরের বাতাসে কাঁপছে, ঐ যে বন-মূলোর ঝাড় ছাদের আলসেতে জন্মেছে, আমার ছাত্র বিভূতি - দু-হাজার বছর আগে এরা সব কোথায় ছিল? দু’হাজার বছর পরেই বা কোথায় থাকবে? এদের সমস্ত ছোটখাটো সুখদুঃখ আনন্দ-হতাশা নিয়ে ছোট্ট বুদ্ধুদের মত অনন্ত গহন গভীর কালসমুদ্রে কোথায় মিলিয়ে যাবে, তার ঠিকানাও মিলবে না - আবার নতুন লোকজন ছেলেপিলে আসবে, আবার নতুন ফুলফলের দল আসবে, আবার নতুন সব সুখদৈন্য হর্ষহতাশা আসবে, কত মিষ্টি জ্যোৎস্না-রাত্রির মাধবী বাতাস আবার বইবে, পুরোনো উজ্জয়িনীর কেশধূপ বাস যেমন মদির ছিল, ভবিষ্যৎ কোন বিলাস-উজ্জয়িনীতে নতুন কেশরাশি পুরোনো দিনের চেয়ে কিছু কম মদির হয়ে উঠবে না, কত গ্রাম্য-নদী ভবিষ্যতের অনাগত গ্রাম-বধূদের সুখদুঃখ সম্ভার নিয়ে বয়ে চলবে… আবার তারা যাবে, আবার নতুন দল আসবে। কিন্তু তুমি ঠিক আছ। হে অনন্ত, যুগে যুগে তুমি কখনো বদলে যাও না। সমস্ত পরিবর্ত্তনের মধ্য দিয়ে, সমস্ত ধ্বংস-সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অপরিবর্ত্তিত, অনাহত তুমি যুগ থেকে যুগান্তরে চলেছ। এই দৃশ্যমান পৃথিবী যখন আকাশে জ্বলন্ত বাষ্পপিণ্ড ছিল, তারও কত অনন্তকাল পূর্ব্ব থেকে তুমি আছ, এই পৃথিবী যখন আবার কোন দূর অনির্দ্দিষ্ট ভবিষ্যতে, যখন আবার জড় পদার্থের টুকরোতে রূপান্তরিত হয়ে দিকহারা উল্কার গতিতে উদ্ভ্রান্ত হয়ে অনন্ত ব্যোমে ছোটাছুটি করবে, তখনও তুমি থাকবে। কালের অতীত, সীমার অতীত, জ্ঞানের অতীত কে তুমি - তোমাকে চেনা যায় না। অথচ মনে হয়, এই যেন বুঝলাম, এই যেন চিনলাম। শেষ রাত্রের নদীর জলে যখন চিকচিকে মিষ্টি জ্যোৎস্না পড়ে, শেওলায় কূলে তাল দেয়, তখন মনে হয় সেখানে তুমি আছ, ছোট্ট ছেলে তার কচি মুখ নিয়ে ভুরভুরে কচিগন্ধ সমস্ত গায়ে মেখে যখন নরম হাতদুটি দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে, যেন মনে হয় সেখানে তুমি আছ, ওরায়ণ যখন পৃধিবীর গতিতে সমস্ত রাত্রির পরে দূর পশ্চিম আকাশে ঝুলে পড়ে, সেই রুদ্র প্রচণ্ড অথচ না-ধরা-দেওয়া-গতির বেগে তুমি আছ, জনহীন মাঠের ধারে গ্রাম্য ফুলের দল যখন ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে অকারণে হাসে তখন মনে হয় তাদের সেই সরল প্রাণের প্রাচুর্য্য তার মধ্যে তুমি আছ। তাই বলছিলাম যে কাল শেষরাত্রে তোমাকে হঠাৎ দেখলাম। অন্ধকার প্রহরের শেষ রাত্রের চাঁদ তার পার্শ্ববর্ত্তী শুকতারার পেছনে। তোমায় প্রণাম করি - আজ কলেজের কালভার্ট বেয়ে উঠছিলাম। বেলা পাঁচটা, ঠিক সন্ধ্যেটা হয়ে এসেছে, ছোট ছোট সেই অজানা রাঙা ফুলগাছগুলোর দিকে চেয়ে কেমন হঠাৎ আনন্দ এসে পৌঁছলো - নাথনগরের আমগাছগুলোর ওপর সূর্য্য অস্ত যাচ্ছে, কেমন রাঙা হয়ে উঠেছে সেদিকের আকাশটা - এই সামান্য জিনিষের আনন্দ, কচিমুখের অকারণ হাসি, রাঙা ফুলগাছটা, নীল আকাশের প্রথম তারা, ঐ যে পাখীটা বাঁকা ডালে বসে আছে, সবশুদ্ধ মিলে এক এক সময় জীবনের কেমন গভীর আনন্দ এক এক মুহূর্ত্তে আসে। মানুষ এই আনন্দ জানতে না পেরেই অসুখে, হিংসায় স্বার্থদ্বন্দ্বে সুখ খুঁজতে গিয়ে নিজেকে আরও অসুখী করে তোলে… আজ যে মার্টিন লুথারের জীবনী পড়ছিলাম, তাতে মনে হোল এক এক সময় এক-একজন ব্রাত্যমন নিয়ে পৃথিবীতে এসে শুধু যে নিজেই স্বাধীন মত ব্যক্ত করে চলে যায় তা নয়, জড়মনকেও বন্ধন-মুক্ত করে দেবার সাহায্য করে। যেমন সহস্র বৎসরের পুঞ্জীকৃত অন্ধকার এক মুহূর্ত্তের একটা দেশলাইয়ের কাঠির আলোতেই চলে যায় - তেমনি। কাউকে ঘৃণা করতে হবে না। এ জগতে যারা হিংসুক, স্বার্থান্ধ নীচমনা তাদের আমরা যেন ঘৃণা না করি… শুধু উচ্চ জীবনানন্দ তাদের দেখিয়ে দেবার কেউ নেই বলেই তারা ঐ রকম হয়ে আছে। কোন্ মুক্ত পুরুষ অনন্ত অধিকারের বার্ত্তা তাদের উপেক্ষিত বুভুক্ষাশীর্ণ প্রাণে পৌঁছে দেবে? ॥ ২৭শে অক্টোবর, ১৯২৪, কলিকাতা ॥

