দেশভাগের ভাঙা আয়না ও শচীন চক্কোত্তি । রাজা সরকার

WhatsApp Image 2021-06-12 at 4.28.41 PM.jpeg

বিষয় : গল্প

প্রচ্ছদ : শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়

মূল্য : ₹ ৩০০

মণিকর্ণিকা প্রকাশনী

যোগাযোগ (কল ও হোয়াটস্অ্যা‌প) : 8240333741

Amazon Button PNG.png
Our Store Button PNG.png
আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির একটি গল্প এখানে দেওয়া হল।

বর্ডার

 

চৈত্যা ওরফে চৈতন ওরফে চৈতন্য যিশুখ্রিস্টের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। যিশুখ্রিস্টের পেছনে একটা ক্রুশ কাঠ ছিল। চৈতন্যর পেছনে কিছু নেই, শুধু হাওয়ায় ভাসা একটা প্রান্তর। এই প্রান্তরটা ইন্ডিয়া। সামনে দুইতলা বাড়ির সমান উঁচু কাঁটাতারের বেড়া যা সীমান্ত বলে চিহ্নিত। আগেকার খর্বকায় সীমান্তের

        চিহ্নস্বরূপ পাকা পিলারগুলো কোথায় আছে চৈতন্য জানে না। জানার দরকারও হয় না। কারণ এই উঁচু কাঁটাতারই এখন সীমান্তের চিহ্ন, যা ডাইনে বাঁয়ে যে কত দূর চলে গেছে চৈতন্য জানে না। কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে দেখা যায় এদিকের মতোই কিছুটা প্রান্তর ওদিকেও, বা ভালো করে তাকালে দূরে কিছু গ্রাম বা চাষবাসের খেত বা একটু ভালো করে তাকালে দু-একজন মানুষও দেখা যায়।

ওটা এখন বাংলাদেশ।

        চৈতন্য এইভাবে যতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে ততক্ষণ সামনের এই উঁচু কাঁটাতারের বেড়াটি থাকে না, সরে যায় অথবা মিলিয়ে যায়। চৈতন্য তখন পরিষ্কার দেখতে পায় একটি গ্রাম, পলাশপু্‌র, একটি বাড়ি, দুটি নুয়ে পড়া টিনের ঘর, কিছু গাছপালা কিংবা কোনো ঘরের চওড়া বারান্দায় সেই কবেকার ঘোলাটে আলপনা, তার মধ্যে একটি নাম না জানা গাছের চারা দাঁড়িয়ে। চারাটি বড়ো হয় না। সেই কবে থেকে যে সে দেখছে। ঘরের চালের উপর অদৃশ্য এক পাটাতনে তার বাবা শ্রী বিষ্ণুচরণ বণিকও ঠিক ওইরকম, কতদিন যাবৎ যে দেখছে। কোনোদিন চিৎ হয়ে শুয়ে থাকেন, কোনোদিন সাধুদের মতো বসে থাকেন, কোনোদিন পায়চারি করতে থাকেন আর নিজের মাথার চুল ছিঁড়ে হাওয়ায় ওড়াতে থাকেন। হাওয়ার অদৃশ্য আগুনে সেই চুল পুড়তে থাকে।

         এইরকম এলোমেলো অনেক দৃশ্যপটে চৈতন্য চিনে নেয় এটাই তার দেশ, তার দিদির দেশ, তার বাবার দেশ, তার মায়ের দেশ।

         কখনও এমনও হয় যে চৈতন্য ক্রমে ছোটো হয়ে যায়, বলা ভালো, বালক হয়ে যায়। তখন সে দেখতে পায় খেলার মাঠ, ইস্কুল ঘর, হেডমাস্টার, পিয়ারা খাতুন, আব্দুল, কমল, ননী ও আরও অনেক বালক-বালিকা, সবই চলমান, কিংবা নুয়ে পড়া ঘরের আঙিনায় আধ-ঘোমটা দেয়া একজন মহিলা, তার চলমান অবয়ব। যার ঘোমটা সরালে হয়তো দেখা যাবে এই মহিলা তার মা। কিন্তু কোনোদিনই এই সন্দেহের নিরসন সে করতে পারে না। বেলা ঢলে যায়। সন্ধে হয়ে আসে। অন্ধকার ধেয়ে আসে।

ভাঙা-গলায় চৈতন্য ডাকে - মা, ওমা কোথায় তুমি? কবে আসবা? চৈতন্যর কথা কেউ শুনতে পায় না। চৈতন্য নিজেও কি শোনে? হয়তো শোনে না। তার ভাঙা-গলায় ফ্যাস ফ্যাস করে বলে চলে - কবে আসবা, কবে আসবা, কবে আসবা…

         কিন্তু বাস্তবে এই সময় কাছাকাছি গাছের ছায়ায় দাঁড়ানো দুজন সশস্ত্র বিএসএফ দৃশ্যটা দেখে আর মনে মনে ভাবে - পাগল যে কত কিসিমের হয় কে জানে! যদিও তারা এজন্য বিশেষ কিছু করে না। কারণ তাদের ঠিক করে দেয়া নির্দিষ্ট লাইনের এপারেই থাকে চৈতন্য। ওপারে যায় না বা যাওয়ার চেষ্টা করে না। লাইন পার না হলে অফিসারের নির্দেশ আছে ওকে ডিস্টার্ব না করার। ফলে তারা কিছু করে না। শুধু নজর রাখে।

         এই কাজটা চৈতন্য কবে থেকে শুরু করল, কতদিন যাবৎ করে যাচ্ছে, এই বিষয়ে কাছাকাছি বিএসএফ ক্যাম্পে একটা ধারণা সঞ্চিত আছে। এক ব্যাচ বদলি হয়ে চলে গেলে অন্য ব্যাচ এই কাহিনিটা হাত-বদল করে নিয়ে নেয়।

         প্রথম প্রথম চৈতন্যকে ধরা হত। ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে জেরা করা হত, দু-একটা চড়-থাপ্পড়ও দেয়া হত। অবশ্য খবর পেয়ে চৈতন্যর বাবা বিষ্ণুচরণ এসে কর্তাদের হাতে-পায়ে ধরে, পরিচয়পত্র দেখিয়ে ছাড়িয়ে আনতেন। বলতেন, আমার ছেলেটার মাথার দোষ আছে। তখন চৈতন্যের বাবা বেঁচে।

 

                                               ২

চৈতন্যের বাবা এখানে এসে একটা দোকান দিয়েছিলেন। ভালোই চলত সেটা। দেশগাঁয়ের ব্যবসায়ী মানুষ বলে হাতে কিছু নগদ টাকা ছিল। তাই দিয়ে দেশান্তরের পর ভাসতে ভাসতে পশ্চিম বাংলার সীমান্তের কাছাকাছি এই বল্লভপুর গ্রামেই তিনি ঘর বাঁধেন, সঙ্গে দোকানটিও বাঁধেন। সেই থেকে আমৃত্যু তাঁর বসবাস ও দোকান এই গ্রামেই। এটাই ছিল তাঁর একমাত্র জীবিকা। দোকানদার হিসেবে তাঁকে সকলেই চিনত। মালতীর বিয়ে তিনি বেঁচে থাকতে দিয়ে দেন। মালতীর বিয়ের পর-পর বিষ্ণুচরণ তাঁর আদরের চৈতনকেও বিয়ে দেন। ঘরের লক্ষ্মী ছেলেবউ ঘরে আনেন। সময়ান্তরে ছেলের ঘরের নাতি-নাতনীর মুখ দ্যাখেন। সংসারে সুখও এসেছে।পুরোনো স্মৃতিতে পলি পড়েছে। যদিও দেশ ছাড়ার সময় থেকে মনের মধ্যে যে কাঁটাটি তাঁর বিঁধে ছিল তার কোনো উপশম নেই। বুঝে গেছেন - এ তাঁর আমৃত্যু সঙ্গী। ১৯৭১ সনের শেষদিকে একবার এই কাঁটা মোচনের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। যুদ্ধের পর বর্ডার খোলা ছিল কিছুদিন। কত মানুষ তখন আসা-যাওয়া করেছে। তাই দেখে বিষ্ণুচরণের ইচ্ছে হয়েছিল একবার পলাশপুরে যেতে। ছেলেমেয়ে তখন বড়ো। সব বোঝে। তারাও ভেবেছিল মায়ের জন্য এবার একবার চেষ্টা করা যায় কিনা। শেষমেষ ঠিক হয়েছিল বাবা একাই যাবেন, তারা ভাইবোন কদিন এদিকে দোকান সংসার চালিয়ে নেবে। কিন্তু সাতদিনের মাথায় বাবা ফিরে আসেন শুষ্ক, বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে। ঘরের বারান্দায় বসে সেদিনই তারা ভাইবোন প্রথম দেখল - তাদের বাবা কাঁদছেন। কোনো কথা বলছেন না, শুধু কেঁদেই যাচ্ছেন। এই সাতদিন ভাইবোনের মনে যে স্বপ্নটা তৈরি হয়েছিল সেটা তাদের বাবার কান্নার সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে গেল।

            পলাশপুর বিষ্ণুচরণ গিয়েছিলেন ঠিকই। কিন্ত এই সময়ান্তরে পলাশপুর আর পলাশপুরে ছিল না। পলাশপুর, সোজা-কথায়, হারিয়ে গিয়েছিল। তার জায়গায় এসে গিয়েছিল অন্য নাম, নিয়ামতপুর। পলাশপুর যেমন নিয়ামতপুর হয়ে গিয়েছিল তেমনি পলাশপুরের ভূ-প্রকৃতিও বদলে গিয়েছিল ব্যাপক। অনেক কষ্টে বিষ্ণুচরণ খুঁজে পেয়েছিল, বলা ভালো, ধারণা করতে পেরেছিল যে তাঁর ভিটেটি ও ভিটে-সংলগ্ন জঙ্গলটি এখানেই ছিল। কিন্তু এখন আর নেই। সমস্তটাই তখন আবাদি খেত। একফালি রাস্তায় দাঁড়িয়ে যখন বিষ্ণুচরণ ভিটেটি খুঁজছিলেন তখন পাশে এসে একজন তাঁকে অবাক-চোখে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। একসময় নানা প্রশ্নাদির মুখেও পড়লেন বিষ্ণুচরণ। শেষে আলাপ পরিচয়ে বেরিয়ে গেল যে প্রশ্নকর্তা ধনঞ্জয় বিষ্ণুচরণের বন্ধু জগবন্ধুর ছেলে। জগবন্ধু কলমা পড়েছিল সেই সময়। ফলে তাদের বর্তমান নাম অন্য কিছু, যা ধনঞ্জয় আর বলতে চায়নি। বিষ্ণুচরণ চেষ্টা করে তাঁর একসময়ের গ্রাম প্রতিবেশী জগবন্ধুর সঙ্গেও দেখা করে। কিন্তু সে মলিনার কোনো খোঁজ দিতে পারেনি। শুধু বলেছিল একটা সন্দেহের কথা যে ওই গোলমালের সময় অনেকেই মারা গেছে, হয়তো মলিনাবৌদিও সে সময় - এই পর্যন্ত বলে জগবন্ধু শুধু বিষ্ণুচরণের হাত ধরে চোখের জল ফেলেছিল। চোখের জলের অনেক ভাষা থাকে। বিষ্ণুচরণ তার আর কোনো সন্ধান করেনি।

            বন্ধুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিষ্ণুচরণ গ্রামের পথে হাঁটতে থাকে। আর হাঁটতে হাঁটতে পলাশপুরকে একবার সে ফিরে পায়। সেই পলাশপুর মলিনার পলাশপুর। সেখান থেকে মলিনা তাকে ডাকেও। কিন্তু মলিনার হাতটা সে ধরতে পারেনি। তার আগেই দুইদিনের নাওয়া-খাওয়াহীন ভ্রমণ তাকে আর দাঁড়িয়ে থাকতে দেয়নি। জগবন্ধুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিষ্ণুচরণ অজ্ঞান হয়ে পথের মধ্যেই পড়ে যায়। পেছন পেছন ধনঞ্জয় থাকায় তাঁকে পথে বেশিক্ষণ পড়ে থাকতে হয়নি। সেদিন বিষ্ণুচরণের আর ফেরা হয়নি। বন্ধুর বাড়িতেই রাতটা এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে কাটিয়ে পরদিন পথ ধরতে হল।

 

                                               

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শোক-দুঃখ, তা যতই ভারী বা গভীর হোক, একদিন তা কিছুটা হলেও ভুলতে হয়। অন্তত যতখানি বাঁচার জন্য দরকার, ততখানি তো ভুলতে হয়ই।

            কিন্তু চৈতনের কী হল? তার যে সংসারে মন নেই! বিষ্ণুচরণ এখন বৃদ্ধ। তাদের পরিপূর্ণ সংসার। এ-সংসার এখন চৈতন্যেরই। তাঁর অবর্তমানে যুবক চৈতন্যেরই দোকানের ভার নেয়ার কথা। কিন্তু সে দোকানে বসে কই। কিছুদিন যাবৎ দেখা যায় সে রাত নেই, দিন নেই, নতুন হওয়া কাঁটাতারের বেড়ার আশে পাশে খালি ঘুরে বেড়ায়। কাঁটাতারের বেড়ার কাজ আরম্ভ হওয়ার পর থেকেই তার এই পরিবর্তন। এ তো দেখার কিছু নেই। দুদেশের সীমান্ত কাঁটাতারে ঘেরা হচ্ছে। এর মধ্যে দেখার কি আছে কেউ বুঝতে পারে না। কিন্তু বিষ্ণুচরণের বুক কাঁপে আশংকায়। চৈতন্য পাগল হয়ে যাচ্ছে না তো? প্রথম প্রথম স্থানীয় বিএসএফ ক্যাম্পের লোকেরা সন্দেহ করত, কিন্তু বিষ্ণুচরণের ছেলে বলে সেই সন্দেহ গাঢ় হতো না। বোঝা যাচ্ছিল ছেলেটির মাথায় দোষ আছে। কিন্তু বর্ডারে কড়াকড়ি হওয়ায় কেউ কেউ সহ্য করলেও আবার কেউ কেউ ধমক-ধামক দিয়ে সরিয়ে দিত। কোনোসময় ধরে আটকেও রাখত। বিষ্ণুচরণ ভাবে আর নানান আশংকায় তলিয়ে যেতে থাকে।

            দেশগাঁয়ে থাকতে স্থানীয় বাজারে বিষ্ণুচরণের চালের ব্যবসা ছিল। বড়ো কিছু নয়, তবে ভালোই চলত। জোতজমি তাঁর তেমন ছিল না। সেসব তাঁর বাবার আমলে শরিকি বিবাদে নষ্ট হয়ে গেছিল। শেষে মাত্র বিঘা খানেকের মতো ফসলের জমি যা বাঁচাতে পেরেছিলেন তাঁর বাবা, তাতে বছরে একবারই কিছু ফসল হত। বাকি সময় গাঁয়ের গরু-বাছুরের ঘাস খাওয়ার জমি হিসেবেই থাকত।

            ১৯৫২ সনের রায়টের পর সে জমির আর চাষ-আবাদ হয়নি। জমি সেই থেকে বোবা হয়েই রয়ে গেল। বিষ্ণুচরণরও বোবা হয়ে গিয়েছিল। চৈত্যা তখন ছোটো। তার বড়োটা মেয়ে, মালতী। সেও ছোটোই। তবু সে তখন কিছু কিছু বুঝতে শিখেছে। তাদের গ্রামে তখন হঠাৎ হঠাৎ কার কার যেন বিয়ে হয়। বিয়ে নিয়ে সে প্রশ্ন করলে মা বাবা কেউ কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয় না। শুধু ‘চুপ কর’ বলে থামিয়ে দেয় তাকে।

১৯৪৬-এর দাঙ্গার কথা বিষ্ণুচরণ তাঁর বাবার মুখে শুনেছিল। তাদের পাশের জিলা নোয়াখালিতে সেসব হয়েছিল। তবে তাদের এলাকাতে তেমন বিপদ হয়নি। তবু বাড়িতে বা গ্রামের শরিক ও প্রতিবেশীদের মধ্যে সেসব নিয়ে তখন নানান আতঙ্কের কথাবার্তা হতো। কিছুদিন পর সেসবও থেমে যায়। দেশ ভাগ হয়, দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু সেই আতঙ্কের হাওয়া কমে কই, বরং বাড়ে, বেড়েই চলে। এরই মধ্যে কেউ কেউ গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। কেউ কেউ বলে দেশ ভাগ হইলে আমাগো কী করনের আছে, কেউ বলে না না যামু কই, মরতে হইলে বাপঠাকুর্দার ভিটাতেই মরব। আবার কেউ মনে মনে আশা করে গোলমাল আর কয়দিন। মাথার উপর যে সকল মানুষেরা থাকেন তাদের মতিগতি বোঝা বিষ্ণুচরণের মতো মানুষের সাধ্য নয়।

           এই করতে করতেই আসে ১৯৫২ সালের আশ্বিন মাস। ফসল কাটার সময়। এইসময় একদিন তাদের বাজারে কিছু গোলমাল হল। দোকানপাট ভাঙাভাঙি হল। কেউ কেউ গোলমাল থামানোর চেষ্টা করল। এরকম অবশ্য মাঝে মাঝে হয়, কিন্তু এবার অন্যরকম গন্ধ পেলেন বিষ্ণুচরণ। একটা চাপা আক্রোশ বাতাসে। এদেশের ভাগীদার, নিরঙ্কুশ ভাগীদার কে, তা নিয়ে খুন আর রক্তপাত। এই নিয়ে সেদিন চিন্তিত মনে ব্যবসাপত্তর গুটিয়ে বাড়িতে এসে বিষ্ণুচরণ শোনে, বলা ভালো বাড়িতে আসতে আসতে পথেই কানে আসে যে তাঁদের গ্রামখানি নাকি অবরুদ্ধ। অবরুদ্ধ মানে? বিষ্ণুচরণ পরিষ্কার বুঝতে পারে না। আর পাঁচটা কৃষিজীবী গ্রামের মতোই তাদের গ্রাম। তবে হিন্দুপ্রধান। চারপাশে সকল গ্রামই মুসলমান প্রধান। কিন্তু বিষ্ণুচরণ তাঁর বাবা-মায়ের জীবিত কাল থেকে এই পর্যন্ত এর জন্য কোনো সমস্যা হয়েছে বলে তো শোনেনি। সে বুঝতে পারে না হঠাৎ কী এমন হল! বাড়ি আসতে আসতে এও শুনতে পেল যে গ্রাম থেকে কেউ নাকি পালিয়ে যেতে পারবে না কোনোদিকে। চারদিকে পাহারা আছে। লিডারের অনুমতি ছাড়া পরদিন থেকে বাজারে যাওয়াও সম্ভব না। লিডার কে? না, উনি বহিরাগত একজন বিখ্যাত আলেম। ওনার ফতোয়া - সাত দিন সময় দেয়া হয়েছে, এর মধ্যে কলমা পড়ে মুসলমান না হলে বাড়ির পুরুষমানুষদের কী করা হবে তা যথাসময়ে জানা যাবে। তবে মেয়েদের বয়স অনুযায়ী ব্যবস্থা করা হবে।

পরবর্তী সাতদিন পলাশপুর গ্রাম সত্যি সত্যি নানারকম ভাবে ধস্ত হল। যারা সপরিবারে মুসলমান হল তারা প্রাণে বেঁচে গেল। কিন্তু বাঁচলেও তাদের বারো বছরের অধিক বয়সের মেয়েদের শাদি হতে লাগল। সঙ্গে রাতের বেলা শাদির ভোজ হতে লাগল নব্য মুসলমানের বাড়ির উঠোনে। বিষ্ণুচরণ মুসলমান হননি, তাই তাঁর নতুন নামকরণও হয়নি। সকাল-বিকাল আলেমের আদেশ তাঁকে শুনিয়ে যাওয়া হয়। তবে মুসলমানী না হলেও তাঁকে সেই ভোজে দাওয়াত দেয়া হয়। যদিও সে দাওয়াত রক্ষা করতে যায় না।

 

                                               

সেদিন তাদের এক-দুটো বাড়ি পরেই বিয়ের আসর চলছিল। হ্যাজাক লাইটের আলো জ্বালানো হয়েছে। তার দু-একটা ফলা আঁধার ভেদ করে সেখান থেকে তাদের উঠোনে ও ঘরের দাওয়ায় এসে পড়েছিল। গত সাতদিন ধরে সারা গাঁও দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল যে চেনা-অচেনা মানুষের দল, তারাই এসবের উদ্যোক্তা। তার উপর হুমকি মারধর তো আছেই। বিষ্ণুচরণের দমবদ্ধ দিন কাটে। কিন্তু পালানোর পথ সে খুঁজে পায় না।

সেদিন একটু বেশি রাতের দিকে চেনামুখ কয়েকজন সশস্ত্র যুবক এসে দুমদাম করে ঢুকে পড়ে তাঁর ঘরে। বিষ্ণুচরণ অবাক। সন্ত্রস্ত। তাঁর মুখের উপর টর্চলাইটের আলো ফেলে একজন বলে - ভাবি রে নিতে আইলাম। দাওয়াত আছে। এই বলে স্ত্রীর হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গেল। বিষ্ণুচরণ কিছু আঁচ করার আগেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেল তারা। বলে গেল, এইমাত্র একটা শাদি হল তো, সেই জন্য একটু রান্নাবান্নার কাজ আছে। আপ্নে তো হালায় দাওয়াত দিলেও যাইন না। তাই ভাবিরে লইয়া গেলাম। রান্নাও করব, দাওয়াতও খাইব।

            বিষ্ণুচরণ অতর্কিত এই ঘটনায় স্তব্ধ হয়ে গেল। হুঁশ আসার পর লাফিয়ে বাইরে যেতে গিয়ে সে উঠোনেই কার যেন ধাক্কায় পড়ে গেল। অন্ধকারে বুঝতে পারল - মানুষেরই ধাক্কা। শুনতে পেল ‘যাছ কই হালারপো, বাঁচতে চাস তো ঘরে যা।’ এই বলে আর-এক ধাক্কায় তাকে ঘরের দিকে ঠেলে দিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সাংঘাতিক কোনো বিপর্যয়ের আশংকায় ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল বিষ্ণুচরণ। রাত ক্রমে পাথরের মতো গড়াতে লাগল। সে না পারল চিৎকার করতে, না পারল স্ত্রীর খোঁজে বাইরে যেতে। শুধু ছেলেমেয়ে দুটোকে আগলে বসে রইল।

           শেষরাতের দিকে মলিনা ফেরত এল। নিজে এল না। তাকে পাঁজাকোলা করে ঘরের বারান্দায় শুইয়ে দিয়ে গেল কয়েকজন। লোকজনের আওয়াজ শুনে দরজা খুলে বিষ্ণুচরণ দেখে অজ্ঞান বিধ্বস্ত মলিনাকে একজন বারান্দায় নামিয়ে রাখছে। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই আগন্তুকেরা অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। বিষ্ণুচরণ কোনোমতে তাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে শুশ্রূষা করার আধঘণ্টা পর মলিনা চোখ খুলল। মলিনার খোলা চোখ বিষ্ণুচরণের মুখ দেখতে পেয়ে জলে ছেয়ে গেল। কিছু বলতে গিয়ে শুধু হেঁচকি তুলল শুধু। তাকে আশ্বস্ত করে চোখ বন্ধ রাখতে বলল বিষ্ণুচরণ।

দ্বিতীয় দিনও একইরকম ঘটল। তখন মরিয়া হয়ে স্থানীয় মাতব্বরের কাছে গিয়ে ভেঙ্গে পড়ল বিষ্ণুচরণ। মাতব্বর শান্ত গলায় বললেন - হুজুরের আদেশ অমাইন্য করছ, আমার আর কী করার আছে। ঠিক আছে তুমি যখন এত কইরা কইতাছ কাইল এইটার বিহিত করবো। আইজ যাও।

           সেই ‘কাইল’ আর আসল না। সেদিন মলিনাকে আর ফেরত দিয়ে গেল না। সারারাত অপেক্ষার পর সকালে বিষ্ণুচরণ বাড়ির বাইরে যেতে গিয়ে প্রহৃত হয়। জিজ্ঞেস করার মতো কাউকে পায় না। এত বড়ো গ্রাম, এত মানুষ, সবই গৃহবন্দি। নিস্তব্ধ শ্মশান। থেকে থেকে কারোর কান্না ভেসে আসে। কে কাঁদে, কার কান্না বোঝা যায় না। কোথায় মলিনা! আচরণে বিষ্ণুচরণ প্রায় অর্ধ-উন্মাদ।

           কদিন পর রাতের দিকে এসে কজন হুমকি দিয়ে গেল - বাড়ি ছাইড়া কাইল রাইতের মধ্যে চইলা না গেলে তোর কবর খোঁড়ার কাম করতে হইবো আমাগোর - বুজছস হালার পো।

           সাতদিনের সময়সীমা বোধহয় শেষ।

           সাতদিনের সীমা শেষ হওয়ার পর কোনো কোনো ঘরে আগুন ও কিছু হত্যাকাণ্ড ঘটে গেল পলাশপুরে। অনিবার্য হয়ে উঠল গৃহত্যাগ। নীরবে নিশিরাতে ছোটো ছোটো দুই ছেলেমেয়ের হাত ধরে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দিল বিষ্ণুচরণ। ছেলেমেয়েদুটো বারবার মায়ের কথা বলাতে বিষ্ণুচরণ একবার শুধু বলতে পেরেছিল, তোরার মা পরে আইব।

           সেই মা আর আইল না। কতদিন গেল। কত ঘাট পার হল বিষ্ণুচরণ, কিন্তু ছেলেমেয়েদের মাকে আর সে আনতে পারল না। রাগে দুঃখে ক্ষোভে একসময় বিষ্ণুচরণ পাগল হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছিল, কিন্তু হতে পারল না। ছেলেমেয়ে দুটোর করুণ চোখ তাঁর হুঁশ ফিরিয়ে আনলো বারবার।

           অতঃপর ভাসতে ভাসতে এই বল্লভপুরে এসে একসময় ঠিকানা নিল বিষ্ণুচরণ। ছেলেমেয়েদের সামনে অপরাধীর মতো মুখ করে থাকে সে। সব কর্তব্য কাজ তার মধ্যেই সে করে চলে। অবসর সময়ে মনে মনে মলিনার সঙ্গে কথা বলে। বলে, আমারে মাফ কইরা দিও মলিনা - কিছুই করতে পারলাম না -

 

                                                 ৫

           বয়সকালে হঠাৎই বিষ্ণুচরণ প্রয়াত হলেন। বাবার মৃত্যুর শোক চৈতন্যকে স্পর্শ করল না। বাবার মুখাগ্নি করে সন্ধেবেলা শ্মশান ফেরত চৈতন্য পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মের তোয়াক্কা না করে চলে গেল। দেখা গেল হাঁটতে হাঁটতে সে গিয়ে তার নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়াল। কাঁটাতারের দিকে মুখ করে দুই হাত দুইদিকে ছড়িয়ে আজও ফ্যাসফ্যাসে গলায় উচ্চারণ করল - এত কাঁটাতার - কীবায় আসবা মা- কীবায়-...