আয়নাতন্ত্র । ঋতম চক্রবর্তী

1.JPG

বিষয় : গল্প
প্রচ্ছদ : ওডিলোন রেডন
প্রকাশনা : মণিকর্ণিকা
মূল্য : ₹৩০০
যোগাযোগ (কল ও হোয়াটস্অ্যাপ) : 8240333741

Amazon Button PNG.png
Our Store Button PNG.png
আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির একটি গল্প এখানে দেওয়া
হল।

অ্যান্ড্রোমিডা

 

ঋতম চক্রবর্তী

১.

মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর যে আলোকিত অংশটা দেখা যাচ্ছে এখন, ওইখানে আমার শহর, ওখানেই তোমরা সবাই আছ। এখন একটা স্পেসস্টেশনে থেমে আছি। আগামীকাল যখন একটা ভেলোসিটি থ্রাস্টার আরও গভীর মহাশূন্যের দিকে ঠেলে দেবে আমাদের মহাকাশযানটাকে, তখন তোমাদের ওখানে রাতে সবাই হয়তো ঘুমিয়ে থাকবে বিছানায়। তাই আগাম শুভরাত্রি।

 

২.

চাঁদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছি। পৃথিবী থেকে চাঁদকে যতটা সুন্দর দেখায়, চাঁদ থেকে পৃথিবীকেও ঠিক ততটাই। তোমরা কেমন আছ?

 

৩.

পুচুর শরীর খারাপের খবরটা পেয়েছি গত-পরশু। তারপর কমিউনিকেশন ছিল না তাই আর কিছু জানি না। খুব চিন্তা হচ্ছে। জানিও।

 

৪.

এইমাত্র মঙ্গলের কক্ষপথ পেরোলাম, যদিও স্বচক্ষে গ্রহটাকে দেখতে পাইনি। বাবার সুগারটা বেড়েছে জেনে চিন্তা হচ্ছে। মেপে খেতে দিও। মা আর পুচু কেমন আছে জানিও।

 

৫.

বিল্টুর মেয়ে হয়েছে শুনে খুব খুশি হলাম। ওরা সুখে থাকুক। বাকিদের খবর জানিও। আমরা বৃহস্পতির দিকে।

 

৬.

কী বলব বুঝতে পারছি না! চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে বাবার মুখখানা। বাবা বাজারের থলি নিয়ে ফিরছে। মাঝে মাঝে বাবার ঘরে ঢুকে দেখতাম টিভিটা চলছে, বাবা কখন জানি না ঘুমিয়ে পড়েছে। সাবধানে চশমাটা খুলে রেখে দিতাম। বড্ড দম বন্ধ হয়ে আসছে। এখানে অক্সিজেন আছে, কিন্তু হাওয়া নেই কোথাও এতটুকুও।

 

৭.

গত কয়েকমাস ধরে বৃহস্পতি দেখলাম দূর থেকে। একটু একটু করে কাছে এলো আবার একটু একটু করে দুরেও সরে গেল তেমনি। চারিদিক অন্ধকার, থমথমে, জনপ্রাণীহীন। বড্ড মনে পড়ছে ওখানকার দিনগুলো। ততই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে মন। যাই হোক, ভালো থেকো।

 

৮.

সবকিছু বেশ ভালো করে মিটেছে জেনে খুশি হলাম। পুচুকে জানিও, ওদের আশীর্বাদ করলাম দূর থেকে। ওরা সুখী হোক। আমরা শনির পথে। এরপর কিছুদিন যোগাযোগ থাকবে না, জায়গাটা ব্ল্যাক জোন। তোমার শরীরের যত্ন নিও। মায়ের যত্ন নিও।

 

৯.

মায়ের খবরটা পেলাম। বয়স হয়েছিল, কষ্ট পাচ্ছিল। পুচুকে বুঝিও, সবাইকে একদিন চলে যেতে হয় এভাবেই। যতদিন বাঁচা, তার মধ্যেই সবকিছু। মায়ের শাড়িতে যে মনখারাপের গন্ধ থাকে, সেটা আজও পাচ্ছি, এতকাল পরে এতদূর থেকেও। মায়া বড়ো জ্বালাতুনে, কিছুতেই পেছন ছাড়ে না। যাইহোক, তোমরা ভালো থেকো। আমরা আপাতত ইউরেনাসের দিকে।

 

১০.

পুচুদের ডিভোর্সের খবরটা পেলাম। মনটা ভালো নেই। প্রিয় মানুষের কাছে থাকা যে কতটা শান্তির, সেটা হয়তো দূরে গেলেই বোঝা যায়। একই শহরে, একই বিছানায় থেকেও মানুষের মধ্যে কত ব্যবধান, তাই না? অথচ দ্যাখো, আমাদের মহাকাশযান আস্তে আস্তে দূরে চলে যাচ্ছে একটু একটু করে, তবুও আমরা... ওকে বুঝিও, সম্পর্কের টান অভিকর্ষের থেকেও জোরালো।

 

১১.

পরিচিত অথবা পরিচয়হীন যা কিছু তোমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে প্রতিনিয়ত, আমি তার কিনারায় এসে ঠেকেছি। আর একটু এগোলেই সম্পূর্ণ অন্য এক জগৎ, যেখানে তোমাদের কোনো নিয়মই আর খাটবে না সেভাবে।

এতখানি পথ, এতগুলো বছর পেরিয়ে আসতে আসতে একটা কথাই ভেবেছি বারবার, এই ব্রহ্মাণ্ডে মানুষই হয়তো সব থেকে একলা এবং নির্জনতম প্রাণী। হয়তো বিজ্ঞানীরা একদিন বুঝতে পারবে, যে পৃথিবীর মতো আর একটাও গ্রহ নেই কোথাও। হয়তো একদিন প্রমাণিত হবে, ওই ফ্যাকাসে নীলচে রঙের গোলাকৃতি বস্তুটাই আমাদের একমাত্র উপযোগী বাসস্থান। সেইদিন সব খোঁজা শেষ হবে। সেইদিন সবাই সব কিছু ছেড়ে আবার ঘরে ফিরে আসবে শেষবারের মতো।

এই কথাগুলো প্রতিধ্বনি হয়ে তোমার কাছে পৌঁছবে যখন, ততদিনে আমাদের মহাকাশযানটা এই অন্ধকারে এগিয়ে যাবে আরও অনেকটা পথ। আসতে আসতে মিলিয়ে আসবে সবকিছু। তবুও আমার স্থির বিশ্বাস, হয়তো কোথাও আবার একদিন দেখা হয়ে যাবে আমাদের। ততদিন, ভালো থেকো।

 

 

ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি

 

খেয়ে, বাসনগুলো কলতলায় রেখে, এঁটো পরিষ্কার করে, ব্রাশ করে এসে অনুরাধা দেখল টিনটিন তখনও জেগে। ঘরের আলো জ্বালিয়ে একমনে মোবাইলে কার্টুন দেখছে।

       ‘এখনও ঘুমোসনি! এবার কিন্তু বাবার কাছে ফোন যাবে। বলে দিলাম।’

কিন্তু কে কার কথা শোনে। টিনটিনের কোনো হেলদোল নেই। উপায়ান্তর না দেখে মোবাইলটা ওর হাত থেকে কেড়ে নিল অনুরাধা। অমনি টিনটিন ভ্যা করে কেঁদে উঠল।

      ‘দিনদিন অবাধ্য হয়ে উঠছিস তুই। শিগগিরি ঘুমো। নাহলে বাবাকে বলছি।’¾ গম্ভীর গলায় বলল অনুরাধা।

        টিনটিন চোখ মুছে বলল,- ‘ছাদে যাব।’

‘এখন নয়, কাল সকালে। এখন সোজা বিছানায় যাবি। যা এখুনি।

      কিন্তু পাছে আবার ভ্যা করে কেঁদে কেটে একাকার করে তাই অনুরাধার বারণ বেশিক্ষণ টিঁকে থাকল না। কিছু পরে নিজেই এসে বলল, ‘চল, কিন্তু পাঁচ মিনিটের বেশি নয়। এখন বাইরে হিম পড়ছে। ঠান্ডা লেগে যাবে।’

       ‘হিম কী?’

       সিঁড়ি বেয়ে ওরা দোতলার ছাদে উঠে এল। ন্যাড়া ছাদ। পুরোনো আমলের একটা চিলেকোঠা ঘর ছাড়া আর কিছু নেই। দক্ষিণে শুধু মাঠ আর খেত, উত্তরে দাঁড়ালে গ্রামের বেশ অনেকটা দেখা যায়। ওরা ওখানে এসে দাঁড়ায়। আকাশে তারা ফুটে আছে অজস্র, কলকাতায় থাকলে এসব কি আর দেখা যায়? শহরের কালো ধোঁয়ায় প্রকৃতির সবকিছু আটকে গেছে। এখানে আকাশ পরিষ্কার, আধখাওয়া আপেলের মতো একটা চাঁদ ঝুলছে সেখানে। সেই আলো এসে পড়েছে গ্রামের উপর। চারিদিকে কুয়াশা জমছে। মাঠের উপর সাদা হয়ে আছে এখানে সেখানে, যেন অদ্ভুত মায়াময় হয়ে আছে গোটা জগৎসংসার। রাস্তায় পঞ্চায়েতের হলুদ আলো জ্বলছে। বাড়িঘরগুলোর দাওয়ায় আলো না থাকলেও, ঘরের আলো বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট। চারিদিকে ঝিঁঝির ডাক।

       ‘চল, অনেক হয়েছে, এবার নীচে চল।- বলল অনুরাধা।

       ‘না, না, এখন নীচে যাব না।’- টিনটিনের জেদ।

       ‘যাবি না মানে? পাঁচ মিনিটের কথা ছিল, টিনটিন। এবার কিন্তু আমি রেগে যাচ্ছি।’-অনুরাধা গম্ভীর গলায় বলল,- ‘এবার কিন্তু ঘুমপাড়ানি মাসিপিসিকে ডাকতে হবে।’

       ‘ডাকো গে যাও। আমি এখন এখানেই থাকব।’- টিনটিন গোঁ ধরে বসে গেল ওখানেই।

      ‘তাই, তো? ঠিক তো? ঠিক আছে।’- বলে এদিক ওদিক তাকিয়ে ভয় দেখানোর ভঙ্গিতে অনুরাধা বলল,- ‘ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি, কোথায় তোমরা? এসো, টিনটিনকে নিয়ে ঘুমের দেশে যাও। এসো... কোথায় তোমরা? অবাধ্য টিনটিনকে নিয়ে যাও, এসো...’

       টিনটিন একটু মিচকি হেসে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কেউ আসবে না। কেউ নেই।’

      অনুরাধা কী একটা উত্তর দিতে গিয়েও থমকে গেল। তার দৃষ্টি সামনের বাড়িগুলোর দিকে। দূর থেকে এক এক করে নিভে যাচ্ছে প্রত্যেকটা বাড়ির ঘরের আলো। ব্যাপারটা অদ্ভুত না? অনুরাধা আর-একটু ভালো করে দেখে, সত্যিই তো। লোডশেডিংয়ের মতো ঝুপ করে নয়, এক এক করে। সঙ্গে রাস্তার আলোগুলোও। নিভছে, আর তার সঙ্গে যেন আর-একটু নিস্তব্ধ হয়ে আসছে চারিদিক। এবং তারও সঙ্গে সঙ্গে কে যেন এগিয়ে আসছে। একজন নয়, দুজন। তাদের দেখা যাচ্ছে না, কারণ তারা অন্ধকারের সঙ্গে হাঁটছে। এক এক করে তাদের বাড়ির আলোটাও নিভে গেল।

       অনুরাধার সারা গা শিউরে উঠল আতঙ্কে। টিনটিনকে কোলে তুলে নিয়ে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে যেতেই বুঝতে পারল লাভ নেই, সিঁড়ি দিয়ে কারা যেন ক্রমশ উপরের দিকে উঠে আসছে। তাদের পায়ের শব্দ নেই কোনো, নিস্তব্ধতাই তাদের উপস্থিতি

জানান দিচ্ছে। অনুরাধা দেখল চিলেকোঠা ঘরের দরজায় তালা দেওয়া। এবার কী হবে!

      ভাবতে না ভাবতে হঠাৎই সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে এল। চাঁদটাও মেঘে ঢেকে গেছে এতক্ষণে। চারিদিকে নীলাভ অন্ধকার। অনুরাধা আড়চোখে তাকিয়ে দেখল তাদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুই আবছায়া নারীমূর্তি। চোখ বলতে কিছু নেই, তবু বেশ বোঝা যাচ্ছে তাদের প্রগাঢ় দৃষ্টি অনুরাধার দিকেই নিবদ্ধ। নিষ্ক্রিয়মান ইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে টিনটিনের দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছে দুজোড়া অন্ধকার বাষ্পময় হাত। অনুরাধা বুঝতে পারল তার জ্ঞানশক্তি লোপ পাচ্ছে একটু একটু করে, বুকের মধ্যে টিনটিন কাঁপছিল কিছুক্ষণ আগেও, এখন শান্ত।

       ‘ফিরে যাও তোমরা, ফিরে যাও’- প্রাণপণ চেঁচিয়ে উঠল অনুরাধা। সঙ্গে সঙ্গে দপ করে জ্বলে উঠল চাঁদটা।

অনুরাধা দেখল- কেউ কোথাও নেই! টিনটিনও নেই!