আকুলপুরের পথ । বাসুদেব মালাকর

Akulpurer Path Cover 1.3-001.jpg

বিষয় : গল্প

প্রচ্ছদ : ঈশ্বর কর্মকার

মণিকর্ণিকা প্রকাশনী

মূল্য : ₹ ২২০

যোগাযোগ (কল ও হোয়াটস্অ্যাপ) : 8240333741

Amazon Button PNG.png
Our Store Button PNG.png
আগ্রহী পাঠকদের জন্য বইটির একটি গল্প এখানে দেওয়া হল।

উড়োজাহাজের মালিক

 

আস্ত একটা উড়োজাহাজের মালিক হওয়া কি চাট্টিখানি ব্যাপার! যত ছোটোই হোক না কেন, সেই উড়োজাহাজের জ্বালানি, দেখভাল, মেরামতের খরচা জোগানো কি মুখের কথা! অগাধ টাকা না থাকলে উড়োজাহাজ পোষা যায় না। কিন্তু, শুনলে বিশ্বাস হবেনা, বোষ্টমদিঘির হালদারবাড়ির গোরাচাঁদদের বাগানে একখানা আস্ত উড়োজাহাজ দিব্যি ডানা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে! খেলনা কিংবা মিস্ত্রি দিয়ে বানানো কাঠের বা টিনের জিনিস নয়, সত্যি উড়োজাহাজ!

        গোরাচাঁদের বাবা রূপচাঁদ হালদার দুটো আমগাছ এবং দুটো নারকেলগাছের গায়ে পুরনো শ্যালো-টিউবওয়েলের মোটা পাইপ দিয়ে আড়া বেঁধে, নীচে বাঁশের ঠেকনা দিয়ে, লোকজন ডেকে কবে, কীভাবে যে তার উপরে প্লেনটাকে চাপিয়েছিলেন, গোরাচাঁদের সে কথা ভালো করে মনে পড়ে না। কিন্তু সে ছোটোবেলা থেকেই জানে, প্লেনটা তাদের। ওটার জন্য তল্লাটের সবাই তাদের চেনে। তাঁদের বাড়িটার নামই হয়ে গিয়েছে ‘প্লেন-বাড়ি’!

       গোরাচাঁদরা এমন কিছু বড়োলোক নয়। বাগানের লাগোয়া বিঘে পাঁচেক পতিত জমি, আর মাঠে আট বিঘে ধানের জমি, এই হল তাদের সম্পত্তি। জমির আয়ে ভালোভাবেই সংসার চলে যেত। তা বলে সত্যি উড়োজাহাজের মালিক হওয়াটা খুবই অবিশ্বাস্য ব্যাপার! অনেকদিন আগের কথা হলেও, এলাকার খুব বুড়োমানুষরা আজও সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাটার কথা মনে করতে পারেন।

গোরাচাঁদের বাবা রূপচাঁদ, তাঁর বাবা অর্থাৎ ঠাকুরদা কালাচাঁদ হালদার খুব খাটিয়ে লোক ছিলেন। যেমন প্রকাণ্ড চেহারা, তেমনই ছিল তাঁর গায়ের জোর! সারাদিন জমিতে খাটাখাটনি করেও তিনি ক্লান্ত হতেন না। পাঁচটা মুনিষের কাজ একলাই করতে পারতেন। একটু বড়ো হতেই ছেলে রূপচাঁদকেও তিনি চাষের কাজে লাগিয়ে দিলেন। রূপচাঁদের তখন কতই বা বয়স! ফাইভ থেকে সবে সিক্সে উঠেছেন। রূপচাঁদের খুব ইচ্ছে ছিল, লেখাপড়া শিখে শহরে গিয়ে চাকরি করবেন। বাপের এক হুঙ্কারে সে ইচ্ছে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। মনের দুঃখ চেপে রেখে তিনি বাপের সঙ্গে চাষবাসের কাজই করতে লাগলেন। তারপর একদিন সেই আশ্চর্য কান্ডটা ঘটল।

        আষাঢ়মাসের শেষ অথবা শ্রাবণের প্রথম দিক। সারাদিন আকাশ কালো হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে ঝমঝম করে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামে। তা বলে বাপ-ছেলে কালাচাঁদ-রূপচাঁদের ছুটি নেই। শুধু তাঁরা কেন, গাঁয়ের কারোরই ফুরসত নেই। জমিতে একহাঁটু জল জমে গিয়েছে। সেই জলের ভিতর লাঙল দিয়ে কাদা করতে হবে। নাহলে সময়মতো আমনধান রোয়া যাবে না।

       সময়টা বাংলা তেরশো উনপঞ্চাশ সাল-টাল হবে। আকাশ দিয়ে মাঝেমাঝেই কান-ফাটানো গর্জন করে সুঁইচোরা পাখির মতো ছোটো ছোটো উড়োজাহাজ সারি বেঁধে তীব্রগতিতে উড়ে যায়! সারা দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ বেধেছে! কোথায় নাকি জাপানিরা বোমা ফেলেছে! তার শোধ নিতে কারা আবার জাপানেও বোমা ফেলে এসেছে৷ যুদ্ধটা ঠিক কোথায় হচ্ছে, গাঁয়ের কারোরই তা ঠিক জানা নেই। কিন্তু নানারকম নতুন নতুন গুজব শোনা যাচ্ছে রোজ। সেই সময় একদিন দুপুরবেলায় সেই মর্মান্তিক কাণ্ডটা ঘটল!

       রূপচাঁদ সেদিন বাবার সঙ্গে মাঠে যায়নি। কালাচাঁদ একাই মাঠে ছিলেন। আশপাশের জমিতেও দু-চারজন ছিল। কালাচাঁদ গরুর কাঁধ থেকে জোয়াল নামিয়ে আলের উপর, একটা সোঁদালগাছের তলায় বসে একটু বিশ্রাম নেবেন বলে ভাবছিলেন, একপশলা জোর বৃষ্টিও নামল হঠাৎ, এমন সময় দূর থেকে মাঠের অন্য লোকগুলো চিৎকার করে উঠল, ‘কালাচাঁদ! মাথা নিচু করে মাটিতে শুয়ে পড়, শুয়ে পড়! তোর মাথার ওপর...’ কালাচাঁদ চমকে উঠে কিছু বুঝবার আগেই দেখতে পেলেন, বিরাট একটা রুপোলি রঙের চামচিকের মতো উড়োজাহাজ প্রায় তাঁর মাথা ছুঁয়ে, কান-ফাটানো শব্দ করে কাদার ভিতর পুঁতে গিয়ে থেমে গেল। দু-হাত ছড়িয়ে দেবার মতো করে ডানা দুটো কাদার উপর, আর লেজের দিকের খাড়া পাখনাটা আকাশের দিকে উঁচিয়ে! সামনের দিকটায় কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে খুব আগুন জ্বলছিল— জলকাদায় আগুনটা বেশি ছড়াল না বটে, ঝমঝম করে বৃষ্টিও হচ্ছিল তখন, কিন্তু লেজটা বিকট শব্দ করে ছিটকে আলাদা হয়ে গেল!

      সবাই হইহই করে ছুটে এল। কিন্তু সাহস করে কেউ কাছে গেল না! কেউ বলল, ওর পেটের ভিতর বোমা রাখা আছে! কেউ বা বলল, এখুনি আবার উড়ে যাবে— তখন চরকির ঘায়ে, যে কাছে যাবে, তার মুন্ডু উড়ে যাবে! কথাটা রটে যেতে আশপাশের দশ গ্রাম থেকে দলে দলে লোকজন ছুটে আসতে লাগল। একবেলার ভিতর কালাচাঁদের জমিটা লোকে লোকারণ্য হয়ে চাষের দফারফা করে দিল।

       একটু সাহস করে সবাই এবার কাছে এসে ঘুলঘুলির মতো জানালা দিয়ে দেখতে পেল, ভিতরে গরুর শিং-এর মতো দুটো হ্যান্ডেল ধরে একজন ধবধবে সাদা সাহেব বসে আছে। সারা গা-মাথা, পোশাকপত্তর আগুনে পোড়া! দেহে প্রাণ আছে বলে মনে হল না।

       উপস্থিত লোকজনের কেউই ওটার দরজা খোলার কায়দা জানে না। কয়েকজন একটু টানাটানি করেও কিছু করতে পারল না। সবাই দূরে দাঁড়িয়ে হায় হায় করতে লাগল। ঝমঝম বৃষ্টিতে তখন বিরাট একটা মরা পাখির মতো প্লেনটা ভিজছে।

       এর দুদিন পরে চার-পাঁচটা জিপগাড়িতে করে একদল গোরা সৈন্য এসে প্লেনের দরজা খুলে লোকটাকে নিয়ে চলে গেল। মৃতদেহ থেকে বেশ দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে তখন। মানুষটা চলে গেল। কোন দেশের মানুষ, কেন, কাদের হয়ে সে আর এক দেশের মানুষকে মারবার জন্য যুদ্ধ করতে এসেছিল, কেউ জানতে পারল না। শুধু তার প্লেনটা কালাচাঁদের জমিতে রয়ে গেল। কেউ এসে আর সেটার খোঁজ নিল না।

মাসখানেক পরে কালাচাঁদ জমি পরিষ্কার করবার জন্য প্লেনটাকে সরাতে লোক লাগালেন। তাদের সরদার বলল, ‘হাতুড়ি-শাবল দিয়ে না ভাঙলে সারানো যাবে না, কত্তা!’ কিশোর রূপচাঁদ বাবার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তখন, বললেন, ‘না বাবা, তুমি বলে দাও, ওটা আস্ত রেখেই সরাতে হবে!

 

                                                দুই

 

শেষ পর্যন্ত কালাচাঁদের বাগানের এক কোণে প্লেনটার ঠাঁই হল। কালচাঁদ ছুতোর-কামার-মিস্ত্রি ডেকে জোড়াতালি দিয়ে, রংটং করে প্লেনটার আগের চেহারা খানিকটা ফিরিয়ে আনল। রঙের মিস্ত্রি ওটার মাথার দু-পাশে দুটো কাজলকালো টানা টানা চোখ এঁকে দিল। কিন্তু একটা নতুন উপদ্রবও শুরু হল! দশ-বিশ মাইল দূর থেকেও লোকজন দলে দলে আসতে প্লেন দেখবার জন্য! মানুষের পায়ের চাপে কালাচাঁদের সাধের বাগানের দফারফা হতে লাগল। তাদের পিছনে পিছনে চানাচুর, ঝালমুড়ি, ঘটিগরমের দোকানিরাও হাজির হয়ে গেল! সারাদিন শুধু লোক আর লোক! বেশ একটা মেলার মতো হয়ে উঠল ব্যাপারটা। তখন একজন বয়স্ক লোক পরামর্শ দিলেন, ‘এক কাজ করো, কালাচাঁদ। ওটার চারদিক চট দিয়ে ঘিরে দাও। তারপর চারআনার টিকিট কেটে লোক ঢোকানোর ব্যবস্থা করো। লালে-লাল হয়ে যাবে! আরে, ওটার পেছনও তো তোমার কম খরচ হয়নি!’

       কথাটা বৈষয়িক কালাচাঁদের মনে ধরল। সারাদিনের শেষে হিসাব করে দেখা গেল, প্রথমদিনেই খরচের দ্বিগুণ টাকা উঠে এসেছে! তারপর যা হয়, আস্তে আস্তে লোকের উৎসাহ কমে এলো। মাস-তিনেক পরে দেখা গেল, প্লেনটা নিঝুম অন্ধকারে বাগানের এককোণে একাকী দাঁড়িয়ে আকাশের স্বপ্ন দেখছে। তার গা বেয়ে তেলাকুচো, জার্মানিলতা এগিয়ে আসছে। পেটের ভিতরে একজোড়া ভাম বাসা বেধেছে। কিন্তু ওটার জন্য কালাচাঁদের বাড়িটার নামই হয়ে গেল ‘প্লেনবাড়ি।’

কালাচাঁদ বছরে একবার ঘষেমেজে রং করে রাখে ওটাকে। মাটিতে পড়ে জং ধরে নষ্ট হবে বলে অনেক লোক লাগিয়ে মাচার ওপর তুলে রেখেছে। সারা বছরে একটা দিন¾ সেই যেদিন প্লেনটা ভেঙে পড়েছিল— বারোই শ্রাবণ, বাগান ঘিরে একটা মেলা বসে এখনও। তার আগে প্লেনটাকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন গোরাচাঁদের মা অসীমা মইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ওটাকে স্নান করিয়ে কপালে একটা বড়ো সিঁদুরের টিপ পরিয়ে পুজো করে।

       এভাবেই অনেকদিন কেটে গেল। গোরাচাঁদ তখন বেশ বড়ো হয়েছে। কালাচাঁদ মারা গিয়েছেন গতবার। রূপচাঁদও বাবার মতো ওটার যত্ন করেন। কালাচাঁদের মতো প্লেনটাও বুড়ো হচ্ছে, বোঝা যায়। মেরামত করতে গিয়ে রিভিট করবার জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না।

      গোরাচাঁদকে চাষের কাজে লাগাননি তাঁর বাবা। এ কবছরের ভিতর তাদের আর্থিক অবস্থাও অনেকটা ভালো হয়েছে, গোরাচাঁদের মাথাটাও খুব ধারালো বলে রূপচাঁদ তাকে আর চাষের কাজে জমিতে নামাননি।

       গোরাচাঁদ এখন ক্লাস এইটে পড়ে। একটু একটু করে তার চোখের সামনে পৃথিবী তার বইয়ের পাতাগুলো মেলে ধরছে। বাংলা-স্যর সেদিন রচনা লিখতে দিয়েছেন, ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য।’ গোরাচাঁদ অনেক ভেবেও ঠিক করতে পারেনি, কী লিখবে! সবাই লিখবে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যারিস্টার, শিক্ষক হতে চায়। গোরাচাঁদ ওসবের কিছুই হতে চায় না, লিখতেও চায় না। সে অন্যরকম হতে চায়। দেশের গণ্ডী ছাড়িয়ে বাইরে যে বিশাল পৃথিবী রয়েছে, কত অজানা দেশ, পাহাড়, জঙ্গল, মরুভূমি, জলপ্রপাত, নদীমুখ, নীলনদ, পিরামিড, মাঝরাতে সূর্যোদয়, টেবল-মাউন্টেনের সমতল চূড়ায় দাঁড়িয়ে পায়ের নীচে কেপটাউন শহর, ভিসুভিয়াসের শক্ত কালো লাভার নদী— সব দেখতে চায় সে! এই বোষ্টমদিঘি ছাড়িয়ে আরও আরও দূরে যেতে হবে! কিন্তু তাহলে তো তাকে পাখি হতে হবে! ‘আমার জীবনের লক্ষ্য পাখি হওয়া’— খাতায় এরকম লিখলে স্যর কত মার্কস দেবেন, সে কি জানে না।

       গভীর রাত। বারান্দায় মাদুর পেতে রচনা খাতা খুলে বসে আছে গোরাচাঁদ। কিছুই মাথায় আসছে না। বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে, মা রান্নাঘরে কীসব করছে। চারদিক নিঝুম হয়ে গিয়েছে। শুক্লা একাদশীর জ্যোৎস্নায় চরাচর মাখামাখি। দূরে, বাগানের কোণায় আমগাছের তলায় প্লেনটার দিকে তার চোখ গেল। তার যদি সত্যিই ওরকম একটা প্লেন থাকত! একদৃষ্টে সে ওটার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ গোরাচাঁদের চোখে পড়ল, প্লেনটার বসার সিটের ওপর কী যেন একটা নড়াচড়া করছে! বেশ বড়োসড়ো চেহারা! কোনো মানুষ কি? আজকাল ভাঙাচোরা বাতিল লোহালক্কড় কিনতে আসে লোকে। তাদেরই কেউ ওটা চুরি করতে আসেনি তো?

       গোরাচাঁদের গাঁতা শিরশির করে উঠল! ভালো করে তাকিয়ে বুঝতে পারল, ওখানে একজন মানুষই রয়েছে, কিন্তু তার চেহারাটা খুবই অচেনা! খুব লম্বা, ধবধবে গায়ের রং, মাথায় জলপাই রঙের টুপি। কীসব খুটখাট করছে ভিতরে বসে! একবার লাফ দিয়ে নীচে নেমে ওটার পেটের কাছে হাত দিয়ে কী যেন দেখল! আবার লাফ দিয়ে উঠে ভিতরে গিয়ে বসল!

       গোরাচাঁদ সিঁটিয়ে গিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সেদিকে। বাবাকে ডাকবে কিনা, ভাবছিল। এমন সময় দেখতে পেল, প্লেনের নাকের ডগার তোবড়ানো প্রপেলারটা বনবন করে ঘুরছে! কিন্তু কোনো শব্দ হচ্ছে না! এর আগে হাজার চেষ্টা করেও ওটাকে একচুল ঘোরানো যায়নি! অথচ আজ...! তবুও লোকটা যেন খুশি নয়! দমাদ্দম করে সে লাথি মারছে প্লেনটার গায়ে!

       গোরাচাঁদের মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল! প্রচণ্ড ভয় এবং বিস্ময় তাকে একেবারে পাথর বানিয়ে দিয়েছে যেন! একটু সম্বিত ফিরে পেতে সে ডেকে উঠল, ‘মা! ও মা, তুমি কোথায়?’ মা সাড়া দিল, ‘এই তো, রান্নাঘরে। কেন?’

 

                                                 তিন

 

সারারাত ভালো ঘুম হল না গোরাচাঁদের। মাঝরাতে কী দেখেছিল সে? স্বপ্ন দেখেছিল?... বাংলা স্যরের দেওয়া ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য, রচনাটা লেখা হয়নি এখনও। কী লিখবে, বুঝতে পারছিল না!

         ভোররাতে নিঃশব্দে উঠে, টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে গোরা খাতাটা টেনে নিয়ে লিখতে লাগল:

‘সবাই মাটির উপরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে মাথা তুলে বড় হওয়ার স্বপ্ন দ্যাখে। আমি সেই আকাশটাকেই ছুঁয়ে দেখতে চাই— আমি বৈমানিক হতে চাই! তা-ও যদি না-পারি তো ভূ-পর্যটক।’

       সকালবেলা রূপচাঁদ বাগানে গিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, ‘গোরা, দেখে যা, কী সর্বনাশ হয়েছে!’ গোরাচাঁদ একটুও বিস্মিত হল না। সে জানে, বাবা কী দেখাতে বাগানে ডাকছে! ধীরেসুস্থে সে কাছে গিয়ে দেখল, প্লেনটা মাচা থেকে মাটিতে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গিয়েছে। কেউ যেন প্রবল আক্রোশে হাম্বুর-হাতুড়ি দিয়ে ওটাকে ভেঙে ফেলেছে! গোরা তো জানে, কে করেছে এসব! কাল রাতে ওর পাইলট এসে ওটাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, অনেক চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু পারেনি। সেই রাগে…