top of page

লক্ষ্মীবুড়ি । সর্বজিৎ সরকার


 

দশমী চলে গেছে তিন দিন হল। দুদিন পরেই পূর্ণিমা। লক্ষ্মীপুজো। একাদশী থেকেই আকাশের মুখ ভার হয়ে আছে। থেকে থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ির দোরগোড়ায় জল জমে যাচ্ছে। পাড়ার পুজোমণ্ডপ একইরকম রয়ে গেছে। একটা বাঁশও খোলা হয় নি। মা ফিরে গেছে কৈলাসে। ডাকের সাজটুকু পড়ে আছে মণ্ডপে। বৃষ্টি পড়ে মণ্ডপের সামনের অংশে এক হাঁটুজল জমে গেছে। একটা বাল্ব ঝুলছে মণ্ডপপ্রাঙ্গণে। শরতরাতের হিমেল হাওয়ায় দুলছে বাল্বটি। হলুদ আলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে মণ্ডপের প্রতিটি কোণ। জলে ভিজে একটি ফিঙে পাখি আশ্রয় নিয়েছে মণ্ডপে। হলুদ আলোর রেখায় ফুটে উঠছে তার অসহায় মুখ। এক থুরথুরে বুড়ি এসে শুয়েছে সেখানে। ঠিক যেখান থেকে তিন দিন আগে দেবী চলে গেছেন ভাসানে। জমা জলে ঘুরঘুর করছে দুটো সাপ। ঠিক চেনা যাচ্ছে না তাদের। রাস্তায় লোকজন বিশেষ একটা দেখা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের রেখা খেলে যাচ্ছে বুড়ির অর্ধনগ্ন শরীর বেয়ে।


লক্ষ্মীপুজোর কেনাকাটা শেষ। ঠাকুর এসে গেছে মণ্ডপে। জমা জল নেমে গেছে। ফিঙে পাখি উড়ে গেছে একা একা। সাপদুটো ড্রেন দিয়ে হয়তো চলে গেছে দূরে। হলুদ আলো খুলে টুনি লাইট আর জোরালো আলোয় সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। আজ আকাশ একদম পরিষ্কার। বৃষ্টি নেই। ঝলমল করে রোদ উঠেছে। ঢাকীরা বৃষ্টিতে ফিরতে পারে নি। লক্ষ্মীপুজোতে ওদের বায়না করা হয়েছে। আজ ওরা আনন্দ করে ঢাক বাজাবে। কিছু টাকা বেশি এলে ছেলেমেয়েগুলোর জন্য জামাকাপড় কিনতে পারবে ওরা। মা কাকিমারা নাড়ু পাকাচ্ছে। লুচি ভাজছে শ্যামলী জেঠিমা। খিচুড়ির ভোগের দায়িত্ব পড়েছে নানু মামার ওপর। খিচুড়ি, লাবড়া, আলুর দম আর চাটনি। শেষ পাতে মিষ্টিও থাকছে। নানুমামাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছে নণ্টে, ভুতো, নীলু। দুর্গাপুজোর পরে লক্ষ্মীপুজোও একসাথে করে সক্কলে। শাঁখ প্রতিযোগিতা হয়। একটা দেশলাই কাঠি দিয়ে মোমবাতি জ্বালানোর কম্পিটিশন হয়। বাজি পোড়ানো হয় পাড়ার মাঠে। পূর্ণিমার আলো মেখে আজ সকলে একসাথে পাত পেড়ে ভোগ খাব।

দুদিন আগে যে থুরথুরে বুড়িটা শুয়েছিল মণ্ডপের ভিতর, আজ সে শুয়ে আছে জ্যোৎস্নামাখা মাঠে। তীব্র কোলাহলের ভিতরে তার মুক্তি নেই। হিমশীতল সন্ধ্যারাতে সে আকাশের তারা গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে পড়েছে। হয়তো মরে গেছে।


দেবীর ভাসান হয়। দেবী চলে যায় কৈলাসে। বুড়ির ভাসান নেই। বুড়ি পড়ে থাকে লক্ষ্মীমেয়ের মতো জড়োসড়ো হয়ে এক বিরাট আকাশের নীচে।

 

ছবি : সংগৃহীত

27 views0 comments

Comments


bottom of page