top of page

বিচ্ছেদকুসুম ও ছায়াতরুর গান । ঋভু চৌধুরী

Updated: Sep 23, 2021


 

আমার পিসির বাড়ির গৃহদেবী জগদ্ধাত্রী। ছোট্ট ছায়াঘেরা সিংহাসনে লোহিতবর্ণ সিঁদুর লেপা ঘট আর অবাঙালীদর্শন দেবীপটে তাঁর নিত্যপুজোর আয়োজন। ঘট এড়িয়ে কষ্ট করে ছবিতে ঠাওর করলে বোঝা যায় ছবির মধ্যে ব্যক্তিত্ব আর গাম্ভীর্যের এমন মিশেল আছে যে দেবীকে দেখে কেমন ভয় ভয় করে। মাতৃমূর্তির লাবণ্য পরিবর্তে দৈবিক দূরত্বের সম্ভ্রমই যেন তাঁর প্রাপ্য। একসময় খুব ধুমধাম করে পুজো হত পিসির বাড়ি। তারপর কবে একদিন সব আড়ম্বর ফুরিয়ে গেল কালের নিয়মে। বাড়িটা দিন দিন হাড়-পাঁজরা বার করে ধুঁকতে থাকল আমাদের লুকিয়ে রাখা ক্ষয়রোগের মতো। আজ কত বছর হয়ে গেছে খুব প্রয়োজন ছাড়া ওই বাড়িতে যাই না আমি। যাই না কারণ আমার শৈশবের অনেকখানি রয়ে গেল ওই বাড়িটার আনাচকানাচে। গেলে বড্ড মন কেমন করে। পিসিমণির না থাকাটা তীব্র হয়ে চেপে বসে বুকের ওপর। দম বন্ধ লাগে। কিছু কিছু বিচ্ছেদকে সময়ও বুঝি যথেষ্ট পরিমাণে নিরাময়ী প্রলেপ দিতে অক্ষম রয়ে যায়। আর সেই বেদনাকুসুম ক্রমে ক্রমে তার বিরহসৌরভে নিজের মধ্যেই কেমন বুঁদ হয়ে ওঠে। তার থেকে পরিত্রাণ নেই যাদের তারা জানে এই বাস্তব পৃথিবীতে চিরকাল তাদের কেমন করে বয়ে বেড়াতে হয় পরবাসী জ্বালা।

আজ অনেক দিন পর পিসির বাড়ি গিয়ে মনে হল আমি বোধহয় একটু একটু করে অনেক স্মৃতিই এবার হারিয়ে ফেলছি ক্রমশ। এই যেমন জগদ্ধাত্রী পুজোর স্মৃতি। টুকরো টুকরো কটা ছবি ছাড়া আর তো কই তেমন কিছু মনে করতে পারি না এখন! অথচ কী ঝলমলে আনন্দময় ছিল সেই দিনগুলো। সেই অনুভূতিটুকু হারিয়ে যাবার নয়।

প্রথমে মনে পড়ছে থোকা থোকা অপরাজিতার দীর্ঘ একটা মালা। শিশুবয়সে সেই ঘন নীল ঠাস-বুনোটের মালাখানাই আমার সবচেয়ে বেশি মনোযোগ হরণ করেছিল হয়তো। ঠাকুমার কোলে বসে দেখতাম ঠাকুর ঘরের ঘুপচি অন্ধকার থেকে বড়োঘরের মাঝে আলপনা আঁকা বেদিতে এনে ওরা কেমন নিপুণ হাতে সাজিয়ে দিচ্ছে নিত্যকার চেনা পট। আর একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে দেবীর অভিব্যক্তি। যে গাম্ভীর্যকে আমি ভয়ই করেছি সে বয়সে তাকে হঠাৎ কেমন হাসিখুশি মনে হত তখন। অঘ্রাণের ফসলখেতের মতো উজ্জ্বল।

মনে আছে আগের দিন থেকে আত্মীয়-কুটুমের ভিড় জমতো। দফায় দফায় খাওয়া দাওয়া, গুলতানি, মচ্ছব। বাইরে গাছতলায় বড়ো উনানে বামুন ঠাকুর বড় কড়ায় শাকচচ্চড়ি রাঁধছে। গন্ধে ম ম করছে চারদিক। ন-দাদু তদারক করছে তার। ন-দিদার রোগা হাড়-জিরজিরে শরীরটা দিন দিন নুয়ে পড়ছিল জলের কিনারে লুটিয়ে পরা লতার মতন। সেই নিয়ে হোম আগুনের একপাশে বসে আছেন তিনি। নিজেকেই যেন আহুতি দেবেন এবার। দেয়ালি পিসি, আমার পিসিমনির ননদ তার আহ্লাদী গালে হাসি ছড়িয়ে হাঁক ডাকে বাড়ি মাথায় করছে সমানে। পিসেমশাইয়ের দাদাকে এমন রাশভারী দেখতে ছিল যে তিনি যে ঘরে থাকতেন ভয়ে তার ধার মাড়াতাম না আমরা যত বাচ্চার দল। আর পিসিমনি অক্লান্ত পরিশ্রমে সামাল দিয়ে চলেছে সব দিক। বদমেজাজি স্বামী, নানান বায়নাক্কা ভরা আত্মীয়-কুটুম্ব, আদরের ভাইপোর অন্যায় আবদার, নিয়মনিষ্ঠা মানা দেবীর যত আচার বিচার... সব! তারই মধ্যে কুমারী পুজো চলছে। লাল পাড় শাদা শাড়িতে আমার সামান্যদর্শনের শ্যামলরঙা পিসিমনি পরম বিশ্বাসে তারই কোনো ভাইঝির পায়ে তুলে দিচ্ছে সহস্রদল পদ্মের অর্ঘ্য। মঙ্গলের শাঁখ বেজে উঠছে মুহুর্মুহু। মনে পড়ে সন্ধে রাতে ছাদে উঠে পিসতুতো দাদাদের সঙ্গে বাজি পোড়ানো। আতসের রোশনাই। আর তারপরের হিম ঢাকা জমাট অন্ধকার।

সব কবে একদিন ভোজবাজির মতন উবে গেল। যে সব আত্মীয়রা ভিড় করে থাকত তখন তাদের অনেকেই আর বেঁচে নেই। পিসিমনি চলে গেছে আজ প্রায় আট বছর হল। বাড়িটা আছে। গাছগুলো একই রকম অতিথিপরায়ণ। অনেকটা বুড়ো হয়ে গেছে ওরাও। কে জানে, আমার মতন অল্প অল্প করে ওদের স্মৃতিও হারিয়ে যাচ্ছে কিনা। পিসিমনির সাথে একটা কাঞ্চন গাছ লাগিয়েছিলাম আমি। সেটা অনেক বড়ো হয়ে গেছে। জানি না সেও আমায় চিনতে পেরেছে কিনা। বাড়ি ফিরে ছিন্নবিচ্ছিন্ন স্মৃতিদের জুড়ে জুড়ে আমি মনকেমনের অখ্যান লিখছি যখন হেমন্তের রোদ্দুর নরম হয়ে মায়াবী আদর ছড়িয়ে রাখছে উঠোনে। উত্তরে হাওয়ারা আরও বেশি করে শীত ডেকে আনছে অলক্ষ্যের কোন হিমঘর থেকে। আর এসবের মধ্যে রামকুমার চট্টোপাধ্যায় আত্মমগ্ন হয়ে গাইছেন অযোধ্যানাথ পাকড়াশির লেখা বিবেকানন্দের সেই প্রিয় গানখানা-

‘মন চলো নিজ নিকেতনে।

সংসার বিদেশে বিদেশীর বেশে

ভ্রম কেন অকারণে।’

সত্যি অনেকদিন হয়ে গেল এ পরবাসে আছি। এই রোদ জল হাওয়া মাটির মধ্যে থেকেও আমি যেন এদের কেউ নই। কী যেন এক শূন্যতা ঘিরে থাকছে আমায়। কী যেন একটা নেই নেই রব। কী এমন খুঁজে মরছি অহরাত্র আমি!

‘মন’ শব্দটা এমন করে গাইছেন রামকুমার যেন সব বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ার প্রতি কখনও শাসন, কখনও কাকুতি, কখনও অসহায় আর্তি জানাচ্ছেন তিনি। নিজের মধ্যে স্থির হয়ে বসতে বলছেন যেন। এমন করে বলছেন, যে আমার মতন অকৃতী অধম অকিঞ্চতকর জনও বুঝতে পারছে — কোনো প্রবাসই চিরকালের হতে পারে না। কোথাও না কোথাও আমারও একটা আশ্রয় আছে, আর সকলের মতো।

সেই পথটুকু কেবল নিজেকে নিজেই যদি আগলে আগলে পার করে দিতে পারি একবার, তবে আমার সব বিচ্ছেদকুসুমরা নিবিড় ছায়ার অরণ্য-গান হয়ে উঠবে একদিন, ঠিক।

 

12 views0 comments

Commentaires


bottom of page