top of page

চলসুর । কৌশিক পাল


 

আজকাল খুব বেশী কিছু লেখার সময় পাইনা। এখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে, একটা গাড়ি ভর্তি গ্রসারি নামিয়ে ছুটে চলেছি বম্বে রোড দিয়ে, পরবর্তী গন্তব্য হাইওয়ের ধারেই কোথাও একটা, গাড়ির ফ্রন্ট ক্যাবে বসে আছি, হাওয়ায় চুল উড়ছে, স্টিরিও সিস্টেমে একটা বলিউডি ফিউশন জনারের ডুয়েট চলছে, ভারি মিষ্টি একটা ইলেকট্রিক পিয়ানোর গ্রুভ বাজছে ট্র‍্যাকটার লো সেকশন জুড়ে। আমি গলা মিলিয়ে গাইছিলাম এতক্ষণ ট্র‍্যাকটার সাথে। এখন আর গাইছিনা, শুধু শুনছি। পথ জুড়ে জীবনপথ মিশে যাচ্ছে অবিরাম।

কিছুদিন আগের কথা, তখন ভরাভর্তি লকডাউন, চাঁদিফাটানো গরম। সকাল বিকেল একটা মোটরসাইকেল নিয়ে এমার্জেন্সি সার্ভিস চালিয়ে রেখেছিলাম ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে। ফেসবুকে তখন আগে মানুষ না আগে অর্থনীতি নিয়ে হাজারো ডিবেট। আমরা হাইওয়ের উঁচু ফ্লাইওভার গুলো একা একা পেরিয়ে যেতাম গাড়িতে এমার্জেন্সি ট্যাগ লাগিয়ে, আমাদের জন্য টোলপ্লাজার গেট খোলা থাকত ভি আই পি লেনে, চব্বিশঘণ্টাই। রাতে ফেসবুকে এসে ডিবেট গুলোতে কিচ্ছুটি উত্তর দিতে ইচ্ছে করতনা, হাসি পেত। এখনো করেনা।

সে যাই হোক, এত হাবিজাবি কথা লেখার জন্য বসিনি এখন। একদিন দুপুরের কথা, পিপিই পরে প্রাণ ওষ্ঠাগত (দন্তাগত পড়তে পারেন, দাঁতে দাঁত চেপেই কাজ করতে হত)। একটা ওয়ারহাউজ প্রিমাইসে খাবার খাইয়ে বেরোব বেরোব করছি, এমন সময় একটা হলুদ কালো এম্বাসেডর গাড়ি এসে দাঁড়াল গেটে। কিছু মাল এসেছে, গাড়ি না পেয়ে ট্যাক্সি চাপিয়ে নিয়ে এসেছেন এক ভদ্রলোক। বাঙালী সুলভ চেহারা নয়, আমি ভূতের পোষাক পরে খালি বাসন কোসন তুলবার যোগাড় করছি, পাশের ডকে তিনি মাল নামাচ্ছেন। আমায় দেখে একটু এগিয়ে এলেন, জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার কাছে একটু খানা হবে ? বহোত ভুখ লাগ গিয়া কাম করতে করতে।'

আমি এমনি এসব এড়িয়ে যাই। কোল্ড এন্ড পিওর লজিক। এসব কেসে এত কনসিকোয়েন্স ডিল করার অভিজ্ঞতা হয়েছে যে পোষায় না। কিন্তু ভরদুপুরবেলা, আমার নিজের পেটের খিদেটাও চড়ে উঠেছে, এইসময় লোকটার ডাক আমায় উত্তর দিতে বাধ্য করল। লোকটাকে বললাম, রুখ যাইয়ে, হাম দেখকে বাতাতে হ্যায় আপকো (বাংলাবাদীরা চাইলে আমার মুণ্ডু নিয়ে নিন, বাংলায় বসে অন্য ভাষায় কথোপকথনের জন্য শুনছি আজকাল দ্বীপান্তর হচ্ছে! ভয় করে বাবা)। লোকটা আবার বলল, খালি সবজি ভাত হলেই চলে যাবে তার, আমি ক্যাম্পাসের ভেতর দেখতে গেলাম।

ডাল তরকারি আর সামান্য পাপড় ছিল দেখলাম, ভাতও হয়ে যাবে বলেই মনে হল একজনের। কিন্তু নন ভেজ ডিশ গোনাগুনতি থাকে, এবং অবধারিত ভাবে শেষ। একবার টুক করে এসে বাইরে বললাম, আপনি শুধু তরকারি ডাল দিয়ে খাবেন তো? আমার মাছ ছিল, শেষ হয়ে গেছে। বলল, বহুত উপকার আপকা সাবজি, সার্ভিসের ছেলে গুলোর কাছ থেকে খাবার নিয়ে এসে থালা ধরিয়ে দিয়ে গেলাম। আমাদের গাড়ীর ড্রাইভারকে বলে দিয়ে গেলাম, খাওয়ার মাঝে যেন একবার জিজ্ঞেস করে নেয়, আর কিছু নেবে কিনা।

পিপিই খোলা, স্যানিটাইজেশন ইত্যাদি করে বেরিয়ে এলাম যখন তখন তার খাওয়া শেষ। আমি তাকে দেখলাম গাড়ীর ভেতর জগন্নাথের ফটোতে ধূপ দিচ্ছে খেয়ে দেয়ে, আমাকে দেখেই লোকটা বেরিয়ে এল। পার্স থেকে বার করে আমায় বলল, খানার দাম কত দেব স্যার? আমি দাম লাগবেনা জানাতে সে একটু কাঁচুমাচু হয়ে বলল, একটু চা খাওয়াতে চায় সে অন্তত। আমি ক্যাম্পাসের মধ্যেই একটা চা দোকানে গেলাম তার এই অনুরোধটুকু রাখতে।

চা খাবার ফাঁকে শুনে যাচ্ছিলাম তার কথা, ওড়িশায় বাড়ি। জগন্নাথের ভক্ত, মাংসাহার করেনা। আজ সুবহতে মাল লোড করার সময় দেরি হয়েছে, পথে কোন দোকান খোলা পাবেনা জানা ছিল। এক দুটো যদিবা পেয়েছে, সেখানে মাংস ভাত ছাড়া কিছু মিলেনি। বিস্কুট জল খেয়ে নিত কিন্তু তার দোকানও পায়নি খোলা, এবং তার দৃঢ় বিশ্বাস তার জগন্নাথের প্রতি ভক্তিই তাকে এই অসম্ভব সময়ে, এত সুন্দর একটা নিরামিষ খাবার জুটিয়ে দিয়েছে।

আমি এমনিতে এইসব এড়িয়ে যাই। কোল্ড এন্ড পিওর লজিক, অযাচিত কন্সিকোয়েন্স। কিন্তু সেইদিন দুপুরবেলায় একজন নাম না জানা ট্যাক্সি ড্রাইভার আমার সামনে দাঁড়িয়ে লজিকের দেওয়াল পেরিয়ে আমায় নিয়ে যাচ্ছিল তার স্বপন মন্দিরে, যেখানে তার জগন্নাথ তার প্রার্থনাপূরণে তথাস্তু হয়ে দাঁড়িয়ে। আমার ভাবতে ভাল লাগছিল, আমি একজন মানুষকে এই দুপুরে এতটুকু আরাম দিতে পেরেছি।

চা খাওয়া শেষ করলাম, লোকটা বলল, একটু গাড়িতে বসুন আপনাকে ছেড়ে দিয়ে আসব ক্যাম্পাসের গেটে। আমি হেঁটেই চলে আসছিলাম, কিন্তু তার কথায় মত বদলে গাড়িতে বসলাম।

থাক্‌ তবে সেই কেবল খেলা,

হোক-না এখন প্রাণের মেলা...

তারের বীণা ভাঙল, হৃদয়-বীণায় গাহি রে।

মনের মধ্যে কোথাও একটা শান্ত ষড়জ বেজে চলছিল যেন, তার স্কেল আমার জানা হয়নি সেদিন....

 


13 views0 comments

Kommentare


bottom of page